গ্রীষ্মকালে বান্দরবানের সেরা রিসোর্ট রিভিউ

গ্রীষ্মকালে বান্দরবানের সেরা রিসোর্ট রিভিউ জানলে কোন রিসোর্টে ভিউ ভালো, কোথায় সার্ভিস ঠিকঠাক সব পরিষ্কার ধারণা পাবেন। গরমে একটু শান্তি খুঁজছেন? বান্দরবানের পাহাড়, মেঘ আর ঠান্ডা হাওয়ায় কয়েকটা দিন কাটালে মনটাই ফ্রেশ হয়ে যায়।
গ্রীষ্মকালে-বান্দরবানের-সেরা-রিসোর্ট-রিভিউ
আজ আপনাদের জন্য পুরোপুরি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে লিখছি বান্দরবানের সেরা রিসোর্ট রিভিউ। লাক্সারি থেকে শুরু করে বাজেট, পরিবার থেকে কাপল সবার জন্যই কিছু না কিছু রয়েছে। চলুন, বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

পেজ সূচিপত্রঃ গ্রীষ্মকালে বান্দরবানের সেরা রিসোর্ট রিভিউ

গ্রীষ্মকালে বান্দরবানের সেরা রিসোর্ট রিভিউঃ কেন এই সময়টা আদর্শ?

গ্রীষ্মকালে বান্দরবানের সেরা রিসোর্ট রিভিউ করতে গেলে প্রথমেই যে কথাটা মনে আসে, সেটা হলো এই সময়টা আসলে বান্দরবান ঘুরতে যাওয়ার জন্য একদম পারফেক্ট চয়েস। সমতলের ঢাকা-চট্টগ্রামে যখন ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি গরমে মানুষ হাঁসফাঁস করছে, তখন বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকায় তাপমাত্রা সাধারণত ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি কম থাকে। সকালে উঠলেই ঠান্ডা হাওয়া গায়ে লাগে, সন্ধ্যায় হালকা জ্যাকেট ছাড়া বাইরে বের হওয়া যায় না। 

আমি গত বছর গ্রীষ্মের শেষ দিকে পরিবার নিয়ে গিয়েছিলাম, তখন দুপুরে একটু গরম লাগলেও বিকেল হতেই পাহাড়ের বাতাস এমনভাবে বয়ে যেত যে মনে হতো প্রকৃতি নিজেই এসি চালিয়ে দিয়েছে। এই কুলিংটা শুধু আরামের জন্য নয়, এটা আপনার পুরো ট্রিপের মুডটাই বদলে দেয়। এই সময়ে বান্দরবানের রিসোর্টগুলোতে থাকার আরেকটা বড় সুবিধা হলো ভিড় কম থাকা এবং প্রকৃতির সৌন্দর্য পুরোপুরি উপভোগ করা। গ্রীষ্মে ইনফিনিটি পুলগুলোতে সাঁতার কাটতে কোনো সমস্যা হয় না, মেঘের সমুদ্র দেখে বারান্দায় বসে থাকতে থাকতে সময় কেটে যায়। 

অন্যান্য ঋতুর তুলনায় এখানকার রাস্তাঘাটও তুলনামূলক ফাঁকা, ট্রেকিং করতে গেলে বা সাইটসিয়িংয়ে যেতে গেলে কোনো হুটোপুটি লাগে না। আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, গ্রীষ্মের এই হালকা আবহাওয়ায় পাহাড়ি খাবারগুলোও বেশি সুস্বাদু লাগে, আর সূর্যাস্তের দৃশ্য তো একেবারে অবিস্মরণীয়। যারা হিট ওয়েভ থেকে একটু পালাতে চান, তাদের জন্য এই সময়টা সত্যিই সোনায় সোহাগা। তবে পুরোপুরি সতর্কতার সঙ্গে বলে রাখি, গ্রীষ্মের শেষভাগে হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়ে যেতে পারে, তাই রেইনকোট বা ছাতা সঙ্গে রাখা উচিত। 

রিসোর্টগুলোতে এসি ফ্যানের ব্যবস্থা থাকলেও আসলে প্রকৃতির এই ন্যাচারাল কুলিং সিস্টেমই যথেষ্ট, তাই অতিরিক্ত ঠান্ডা লাগার চিন্তা করবেন না। যদি আপনি সত্যিকারের শান্তি, সুন্দর ভিউ আর আরামদায়ক আবহাওয়া খুঁজে থাকেন, তাহলে গ্রীষ্মকালে বান্দরবানের রিসোর্টগুলোতে থাকার অভিজ্ঞতা আপনার জীবনের সেরা স্মৃতি হয়ে থাকবে। আমার মতে এই সময়টা না এলে বান্দরবানের পুরো সৌন্দর্যটা ধরাই যায় না।

সাইরু হিল রিসোর্ট লাক্সারির চূড়ান্ত, কিন্তু দামের হিসাব কেমন?

সাইরু হিল রিসোর্টকে বান্দরবানের রাজা বললে একদম ভুল হবে না। শহর থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার দূরে চিম্বুক রোডের উপরে অবস্থিত এই রিসোর্টটা চারপাশে ৩৬০ ডিগ্রি পাহাড়ের অসাধারণ ভিউ দিয়ে আপনাকে একেবারে মুগ্ধ করে ফেলবে। আমি যখন গত গ্রীষ্মে পরিবার নিয়ে গিয়েছিলাম, তখন প্রথমবার গেটে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে মনে হয়েছিল যেন কোনো পাঁচ তারকা হোটেলের পাহাড়ি সংস্করণে চলে এসেছি। চারদিকে সবুজের সমারোহ, মেঘের খেলা আর নির্জনতা সব মিলিয়ে এখানে থাকলে সত্যিই মনটা ভরে যায়। 

লাক্সারির যা কিছু সংজ্ঞা, সবকিছুই এখানে পাবেন, কিন্তু সেটা শুধুমাত্র দেখানোর জন্য নয়, বরং আপনাকে সত্যিকারের আরাম দিতে। রুমগুলো দেখলে আপনার চোখ জুড়িয়ে যাবে। বড় বড় বিছানা, আধুনিক বাথটাব, প্রশস্ত ব্যালকনি যেখান থেকে মেঘ যেন হাত বাড়ালেই ধরা যায় এমন অনুভূতি আমার এখনো মনে আছে। ইনফিনিটি পুলটা তো একেবারে সিনেমার মতো। গ্রীষ্মের বিকেলে সেখানে বসে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে সময় কোথা দিয়ে চলে যায় বুঝতেই পারবেন না।
গ্রীষ্মকালে-বান্দরবানের-সেরা-রিসোর্ট-রিভিউ
আমি দেখেছি অনেকে এখানে শুধু পুলের ধারে চুপচাপ বসে থাকেন, কোনো কথা বলেন না, শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করেন। রিসোর্টের সার্ভিসও অসাধারণ স্টাফরা খুবই বিনয়ী এবং সহায়ক। আপনি যদি একটু প্রাইভেসি চান, তাহলে এখানকার কটেজগুলো আপনার জন্য পারফেক্ট হবে। খাবারের কথা বললে সাইরু হিল রিসোর্ট একেবারে হতাশ করবে না। পাহাড়ি স্থানীয় খাবারের সঙ্গে বাঙালি মেন্যুর চমৎকার মিশেল। সকালের নাশতা থেকে শুরু করে রাতের ডিনার সবকিছুই তাজা এবং সুস্বাদু। 

আমি পরিবার নিয়ে গিয়েছিলাম বলে বিভিন্ন আইটেম ট্রাই করার সুযোগ হয়েছে। বিশেষ করে তাদের গ্রিল্ড চিকেন আর পাহাড়ি সবজির তরকারিটা এখনো মনে পড়ে। তবে এত সব সুবিধার পাশাপাশি একটা বড় প্রশ্ন থেকেই যায় দামটা আসলে কেমন? দামের হিসাব করলে বলতে হয় এটা বান্দরবানের অন্যান্য রিসোর্টের তুলনায় একটু বেশিই। প্রতি রাত ১২ হাজার থেকে শুরু করে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লাগতে পারে, সিজন এবং রুম টাইপের উপর নির্ভর করে। 


আমার মতে এই দামটা যদি আপনার বাজেটে সামর্থ্য হয়, তাহলে একবার অবশ্যই চেষ্টা করে দেখবেন। কারণ এখানে যে আরাম, ভিউ আর স্মৃতি পাবেন, সেটা টাকার অঙ্কে মাপা যায় না। তবে বুকিং অবশ্যই অনেক আগে থেকে করে রাখবেন, বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে। যদি আপনি লাক্সারি চান এবং একটু বেশি খরচ করতে প্রস্তুত থাকেন, তাহলে সাইরু হিল রিসোর্ট আপনার জন্য সেরা পছন্দ হবে।

নীলগিরি হিল রিসোর্টে মেঘের সাথে ঘুমানোর অভিজ্ঞতা

গ্রীষ্মকালে বান্দরবানের সেরা রিসোর্ট রিভিউ করতে গেলে নীলগিরি হিল রিসোর্টের কথা আসবেই। আর্মি পরিচালিত বলে এখানকার সিকিউরিটি আর পরিচ্ছন্নতা একেবারে নজরকাড়া। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৪০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই জায়গায় পৌঁছানোর পর মনে হয় যেন মেঘের রাজ্যে চলে এসেছি। আমি গত গ্রীষ্মে যখন পরিবার নিয়ে গিয়েছিলাম, তখন সকালে ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় পা রাখতেই চারদিকে সাদা মেঘের সমুদ্র দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। হাত বাড়ালেই যেন মেঘ ছুঁয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি হয়।
গ্রীষ্মকালে-বান্দরবানের-সেরা-রিসোর্ট-রিভিউ
রুমগুলো সাদামাটা হলেও খুব আরামদায়ক পরিষ্কার বিছানা, ভালো বাথরুম আর জানালা দিয়ে অবিরাম পাহাড়ি দৃশ্য। গ্রীষ্মের এই সময়ে দিনের বেলায় হালকা গরম লাগলেও সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডা হাওয়া বয়ে যায়, রাতে তো কম্বল ছাড়া ঘুমানো যায় না। এখানে থাকার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো সেই মেঘের সঙ্গে একাত্ম হয়ে ঘুমানোর অভিজ্ঞতা। আমার মনে আছে, এক রাতে বৃষ্টি হচ্ছিল আর জানালার পাশে বসে মেঘের আলো-আঁধারি খেলা দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সকালে উঠে দেখি চারপাশ এখনো মেঘে ঢাকা। 

খাবারও ভালো সাধারণ কিন্তু তাজা আর সুস্বাদু, দামও ৭ থেকে ১০ হাজার টাকার মধ্যে রাখা হয়েছে। ট্রেকিং করতে চাইলে বা শান্তিতে কয়েকদিন কাটাতে চাইলে এটাই আদর্শ জায়গা। তবে লাঞ্চ বা ডিনারের জন্য আগে থেকে বুক করে রাখলে ভালো হয়, কারণ মাঝে মাঝে ভিড় হয়। সব মিলিয়ে গ্রীষ্মকালে যদি পাহাড়ের কোলে সত্যিকারের শান্তি আর মেঘের ছোঁয়া খুঁজে থাকেন, তাহলে নীলগিরি হিল রিসোর্ট আপনার জন্য অবিস্মরণীয় স্মৃতি তৈরি করবে।

গ্রিন পিক রিসোর্ট ইনফিনিটি পুল নিয়ে বাজেটে মজা করুন

গ্রিন পিক রিসোর্ট বান্দরবানের সেই জায়গাগুলোর একটা যেখানে মধ্যবিত্ত পরিবার বা কাপলরা সত্যিকারের আরাম পায় ছোট বাজেটে। শহর থেকে খুব বেশি দূরে নয়, কিন্তু পাহাড়ের মাঝে এমন একটা লোকেশন যে ঢুকলেই মনে হয় আলাদা একটা দুনিয়ায় চলে এসেছি। সবচেয়ে বড় আকর্ষণ অবশ্যই তাদের ইনফিনিটি পুলটা গ্রীষ্মের দুপুরে পুলের পানিতে পা ডুবিয়ে বসলে চারদিকের পাহাড় আর আকাশ যেন এক হয়ে যায়। আমি যখন গিয়েছিলাম তখন পুলের ধারে বসে সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে ভুলেই গিয়েছিলাম যে ঢাকার গরমে কত কষ্ট করছিলাম। 

রুমগুলোও পরিষ্কার, আরামদায়ক বিছানা আর ব্যালকনি থেকে সুন্দর ভিউ লাক্সারি রিসোর্টের মতো ঝকঝকে না হলেও যা আছে তা দিয়ে পুরোপুরি মন ভরে যায়। দামের কথা বললে প্রতি রাত ৫ থেকে ৮ হাজার টাকার মধ্যে পড়ে, যা অন্য অনেক জায়গার তুলনায় অনেক যুক্তিসঙ্গত। এখানে থাকার আরেকটা বড় প্লাস পয়েন্ট হলো ফ্যামিলি-ফ্রেন্ডলি পরিবেশ। আমি দেখেছি অনেক পরিবার এখানে আসে কারণ শিশুদের জন্য আলাদা খেলার জায়গা আছে, আর পুলের পাশে নিরাপদ এলাকা। 

খাবারের দামও সাশ্রয়ী এবং স্বাদ একেবারে ঘরের মতো তাজা সবজি, পাহাড়ি মুরগির তরকারি আর সকালের নাশতায় পরোটা-ডিমের কম্বিনেশনটা এখনো মনে পড়ে। একটু কম লাক্সারি হলেও ভিউ আর সার্ভিস দিয়ে তারা সেটা পুষিয়ে দেয়। গ্রীষ্মে যদি বাজেটে ভালো কিছু খুঁজে থাকেন, তাহলে গ্রিন পিক রিসোর্টে একবার থেকে দেখুন পুলে সাঁতার কেটে গরম ভুলে যাবেন, আর ফিরে এসে বন্ধুদের বলবেন যে টাকা খরচ না করেও কী অসাধারণ অভিজ্ঞতা হয়েছে।

ইকোসেন্স রিসোর্টঃ প্রকৃতির কোলে শান্তি খুঁজে পাবেন

গ্রীষ্মকালে বান্দরবানের সেরা রিসোর্ট রিভিউ করতে গেলে ইকোসেন্স রিসোর্টের কথা না বললেই নয়। এটি একটি পুরোপুরি ইকো-ফ্রেন্ডলি রিসোর্ট যেখানে প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সংযোগ অনুভব করা যায়। চারদিকে ঘন সবুজ বন, পাহাড়ি ঢাল আর অবিরাম পাখির কলরব সবকিছু মিলিয়ে এখানে পা রাখলেই মনে হয় শহরের সব কোলাহল থেকে অনেক দূরে চলে এসেছি। আমি গত গ্রীষ্মে যখন গিয়েছিলাম তখন প্রথম দিন থেকেই এই শান্ত পরিবেশ আমাকে একেবারে মুগ্ধ করে ফেলেছিল। এখানে এলে সত্যিকার অর্থে মনের শান্তি খুঁজে পাওয়া যায়। 


রুমগুলো কাঠের তৈরি, খুবই সুন্দর এবং প্রাকৃতিকভাবে ডিজাইন করা। প্রত্যেক রুমের বড় ব্যালকনি থেকে পাহাড় এবং জঙ্গলের অপূর্ব দৃশ্য দেখা যায়। গ্রীষ্মকালে এখানকার প্রাকৃতিক ঠান্ডা হাওয়া এত আরামদায়ক যে এসি বা ফ্যানের প্রয়োজন খুব কমই পড়ে। সকালে চা নিয়ে বারান্দায় বসে থাকা বা বিকেলে বই পড়তে পড়তে সময় যে কীভাবে কেটে যায় বুঝতেই পারবেন না। এখানকার পরিবেশ এত শান্ত যে কাপলরা বিশেষ করে খুব পছন্দ করেন। 

খাবারের ক্ষেত্রেও তারা স্থানীয় ও অর্গানিক উপকরণ ব্যবহার করে রান্না করে, যার স্বাদ একেবারে ঘরের মতো হয়। সার্ভিস খুবই যত্নশীল এবং বিনয়ী। দাম মাঝারি পর্যায়ে রাখা হয়েছে, তাই যারা বিলাসিতার চেয়ে প্রকৃতির কাছাকাছি শান্তিতে কয়েকটা দিন কাটাতে চান, তাদের জন্য ইকোসেন্স রিসোর্ট সত্যিই একটি চমৎকার অপশন। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, এখান থেকে ফিরে আসার পর মনটা অনেকদিন শান্ত থাকে।

ফরেস্ট হিল রিসোর্ট জঙ্গলের মাঝে কটেজে আরামের ছোঁয়া

ফরেস্ট হিল রিসোর্ট বান্দরবানের সেই জায়গাগুলোর একটা যেখানে শহরের কোলাহল থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে গিয়ে আপনি পুরোপুরি জঙ্গলের মাঝে ডুবে যেতে পারবেন। আমি গত গ্রীষ্মে যখন পরিবার নিয়ে গিয়েছিলাম তখন প্রথমবার কটেজের দরজা খুলতেই মনে হয়েছিল যেন কোনো বনের গভীরে লুকিয়ে আছি। চারদিকে ঘন গাছপালা, পাখির ডাক আর পাহাড়ি হাওয়ার শব্দ সব মিলিয়ে এমন একটা শান্ত পরিবেশ যে শহরের সব টেনশন এক মুহূর্তে উধাও হয়ে যায়। 

কটেজগুলো কাঠের তৈরি, খুবই আরামদায়ক এবং প্রকৃতির সঙ্গে মিশে গেছে। গ্রীষ্মের দুপুরে বাইরে একটু গরম লাগলেও ভিতরে প্রাকৃতিক ছায়া আর হাওয়ায় এত আরাম যে এসির দরকারই পড়ে না। কটেজের বারান্দায় বসে সকালের চা খেতে খেতে চারপাশের জঙ্গল দেখার অনুভূতি আসলেই অবর্ণনীয়। আমি দেখেছি অনেকে এখানে এসে শুধু চুপচাপ বসে থাকেন, কোনো মোবাইল বা ল্যাপটপ ছাড়াই। রুমের ভিতরে সবকিছু সাধারণ কিন্তু পরিষ্কার আরামদায়ক বিছানা, ভালো বাথরুম আর জানালা দিয়ে জঙ্গলের সবুজ দেখা যায়।
গ্রীষ্মকালে-বান্দরবানের-সেরা-রিসোর্ট-রিভিউ
গ্রীষ্মকালে এখানে রাতে ঠান্ডা হাওয়া বয়ে যায় বলে হালকা কম্বল নিয়ে ঘুমালে সকালে একদম ফ্রেশ লাগে। যারা প্রকৃতির কাছাকাছি থেকে আরাম চান কিন্তু লাক্সারির জন্য অতিরিক্ত খরচ করতে চান না, তাদের জন্য এটা সত্যিই আদর্শ জায়গা। সার্ভিসও খুবই যত্নশীল। স্টাফরা বিনয়ী এবং সহায়ক, খাবার তাজা এবং স্থানীয় স্বাদের। 

আমার অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, এখানে থাকলে মনে হয় যেন জঙ্গলের মাঝে নিজের ছোট্ট একটা ঘর পেয়েছি। গ্রীষ্মে যদি বান্দরবান ঘুরতে যান তাহলে ফরেস্ট হিল রিসোর্টের কটেজে একবার থেকে দেখুন আরামের সঙ্গে প্রকৃতির ছোঁয়া একসঙ্গে পাবেন, আর ফিরে এসে অনেকদিন এই স্মৃতি মনে থাকবে।

নীলাচল নীলাম্বরী রিসোর্টের পাহাড়ি ভিউ আর সুবিধা

গ্রীষ্মকালে বান্দরবানের সেরা রিসোর্ট রিভিউ করতে গেলে নীলাচল নীলাম্বরী রিসোর্টের কথা আসবেই। নীলাচল এলাকায় অবস্থিত এই রিসোর্টটা পাহাড়ের একেবারে কোলে বসে আছে, যেখানে পৌঁছানোর পর থেকেই মনে হয় শহরের সব গরম আর হইচই অনেক পেছনে ফেলে এসেছি। আমি গত গ্রীষ্মে পরিবার নিয়ে গিয়েছিলাম, তখন দেখেছি যে সমতলের ৩৮-৪০ ডিগ্রি গরমের তুলনায় এখানকার তাপমাত্রা অনেক কম, আর সকাল-সন্ধ্যায় ঠান্ডা হাওয়ায় হালকা জ্যাকেট লাগে। রিসোর্টের লোকেশনটা এত সুন্দর যে গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে চারদিকের পাহাড়ি দৃশ্য চোখ জুড়িয়ে দেয়। 

যারা ফ্যামিলি নিয়ে ঘুরতে চান বা কাপল হিসেবে শান্তিতে সময় কাটাতে চান, তাদের জন্য এটা সত্যিই একটা ভালো অপশন। পাহাড়ি ভিউয়ের কথা বললে নীলাচল নীলাম্বরী রিসোর্ট একেবারে অনন্য। প্রত্যেক রুমের বড় বড় ব্যালকনি থেকে সামনে পাহাড়ের সারি আর মেঘের খেলা দেখা যায়। গ্রীষ্মের বিকেলে বারান্দায় বসে চা খেতে খেতে সূর্যাস্ত দেখার অভিজ্ঞতা এখনো মনে আছে আকাশ লাল হয়ে যায়, পাহাড়গুলো যেন সোনালি আলোয় ডুবে যায়। 

রুমগুলো পরিষ্কার, আরামদায়ক বিছানা আর আধুনিক বাথরুম সহ সব সুবিধা আছে। আমি যে রুমে ছিলাম সেখান থেকে সকালে উঠে দেখতাম চারদিকে সবুজের সমারোহ, কখনো কখনো মেঘ নেমে আসতো এত নিচে যে হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে দেখা যেত। এই ভিউয়ের জন্যই অনেকে এখানে বারবার ফিরে আসেন। সুবিধার দিক থেকেও রিসোর্টটা খুবই যত্নশীল। খাবার তাজা এবং সুস্বাদু পাহাড়ি স্থানীয় রান্নার সঙ্গে বাঙালি মেন্যুর মিশেল, দামও যুক্তিসঙ্গত।

স্টাফরা খুব বিনয়ী এবং সহায়ক, যেকোনো ছোটখাটো সমস্যায় তাড়াতাড়ি সাহায্য করে। পরিবারের জন্য আলাদা সুবিধা আছে, শিশুরা নিরাপদে ঘুরে বেড়াতে পারে। গ্রীষ্মে এখানে থাকলে গরম ভুলে গিয়ে পুরোপুরি রিল্যাক্স মুডে চলে যাবেন। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, যদি পাহাড়ি ভিউ আর ভালো সুবিধা একসঙ্গে চান তাহলে নীলাচল নীলাম্বরী রিসোর্ট আপনার জন্য সেরা পছন্দ হতে পারে। বুকিং আগে থেকে করে নিলে আরও ভালো রুম পাবেন।

হলিডে ইন বা মেঘলা এরিয়ার রিসোর্ট পরিবার নিয়ে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে ভালো

হলিডে ইন বা মেঘলা এরিয়ার রিসোর্টগুলোকে বান্দরবানে পরিবার নিয়ে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে ভালো বললে একদম ভুল হবে না। মেঘলা লেকের পাশে অবস্থিত এই এলাকাটা শহর থেকে খুব বেশি দূরে নয়, অথচ পাহাড় আর লেকের সুন্দর দৃশ্যে ঘেরা। আমি গত গ্রীষ্মে স্ত্রী আর দুই বাচ্চা নিয়ে গিয়েছিলাম, তখন দেখেছি যে সমতলের গরম থেকে পালিয়ে এখানে এলে বাচ্চারা একদম খুশিতে মেতে ওঠে। সকালে উঠে লেকের পাড়ে হাঁটাহাঁটি করা, বিকেলে পাহাড়ি হাওয়ায় খেলা করা এসবের জন্যই এই জায়গাটা পরিবারের জন্য আদর্শ। 

গ্রীষ্মকালে ভিড়ও তুলনামূলক কম থাকে, তাই শান্তিতে সময় কাটানো যায়। বাচ্চাদের জন্য আলাদা প্লে এরিয়া, নিরাপদ পরিবেশ আর স্পেসিয়াস রুম সব মিলিয়ে মনে হয় যেন নিজের বাড়ির মতোই আরাম পাচ্ছি। রুমগুলো পরিবারের সাইজ অনুযায়ী বড় বড়, বিছানা আরামদায়ক এবং বাথরুমে সব আধুনিক সুবিধা আছে। আমার বাচ্চারা লেক ভিউয়ের ব্যালকনিতে বসে পাখি দেখে খুব মজা পেয়েছিল। গ্রীষ্মের দুপুরে একটু গরম লাগলেও লেকের কাছে হাওয়া এত ঠান্ডা যে এসি চালানোর দরকারই পড়ে না।
গ্রীষ্মকালে-বান্দরবানের-সেরা-রিসোর্ট-রিভিউ
রিসোর্টের চারপাশে নিরাপদ ওয়াকওয়ে আছে, তাই বাচ্চারা একা ঘুরে বেড়াতে পারে, বড়রা চিন্তা করে না। আমি দেখেছি অনেক পরিবার এখানে আসে কারণ এখানে শিশুদের জন্য ছোট ছোট সুইমিং পুল বা খেলার জায়গা থাকে, আর পুরো এরিয়াটা পরিষ্কার ও সুরক্ষিত। এই সব সুবিধার জন্যই পরিবার নিয়ে ঘুরতে গেলে এখানকার রিসোর্টগুলো সবার আগে মাথায় আসে। খাবারের ব্যবস্থাও খুবই ভালো এবং দাম যুক্তিসঙ্গত। 

সকালের নাশতা থেকে রাতের ডিনার সবকিছু তাজা এবং বাচ্চাদের পছন্দের আইটেম আছে। স্টাফরা খুব বিনয়ী এবং সাহায্যকারী, কোনো সমস্যা হলে তাড়াতাড়ি সমাধান করে দেন। আমার অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, গ্রীষ্মে যদি পরিবার নিয়ে বান্দরবান যান তাহলে হলিডে ইন বা মেঘলা এরিয়ার রিসোর্টে থাকলে কোনো হতাশা হবে না। বরং ফিরে এসে সবাই বলবে যে এবারের ট্রিপটা সত্যিই স্মরণীয় হয়েছে। বুকিং আগে থেকে করে নিলে আরও ভালো রুম পাওয়া যায়।

লাবাহ টং বা অন্যান্য মিড-রেঞ্জ অপশন যা মিস করলে পস্তাবেন

লাবাহ টং বান্দরবানের সেই মিড-রেঞ্জ রিসোর্টগুলোর মধ্যে একটা যেখানে হিল ভিউ আর আরাম দুটোই একসঙ্গে পাওয়া যায়। গ্রীষ্মকালে বান্দরবানের সেরা রিসোর্ট রিভিউ করতে গেলে লাবাহ টং এর কথা আসবেই, কারণ এখানে দামের তুলনায় যা সুবিধা পাবেন তা সত্যিই অসাধারণ। আমি গত গ্রীষ্মে কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে গিয়েছিলাম, তখন দেখেছি যে শহর থেকে খুব বেশি দূরে নয় অথচ পাহাড়ের মাঝে এমন একটা শান্ত জায়গা যে মনে হয় যেন আলাদা দুনিয়ায় চলে এসেছি। গ্রীষ্মের ঠান্ডা হাওয়ায় বারান্দায় বসে চা খাওয়ার অভিজ্ঞতা এখনো মনে আছে। 


এখানকার কটেজগুলো সাধারণ কিন্তু খুব আরামদায়ক। বড় ব্যালকনি থেকে সামনে পাহাড়ের সারি আর মেঘের খেলা দেখা যায়, রাতে আকাশ পরিষ্কার থাকলে তারার ঝাঁক দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। খাবারও তাজা এবং সুস্বাদু পাহাড়ি চিকেন আর সবজির তরকারিটা আমার খুব ভালো লেগেছিল। দাম প্রতি রাত ৬ থেকে ১০ হাজার টাকার মধ্যে, যা লাক্সারি রিসোর্টের তুলনায় অনেক সাশ্রয়ী। সার্ভিসও খুবই যত্নশীল, স্টাফরা বিনয়ী এবং সাহায্যকারী। 

যারা বাজেটে ভালো ভিউ আর শান্তি চান, তাদের জন্য লাবাহ টং সত্যিই মিস করা উচিত নয়। লাবাহ টং ছাড়াও বান্দরবানে আরও কয়েকটা মিড-রেঞ্জ অপশন আছে যেগুলো একইভাবে ভালো। যেমন কিছু ছোট ছোট হিল টং বা ইকো রিসোর্ট যেখানে প্রকৃতির কাছাকাছি থেকে আরাম পাওয়া যায়। এগুলোতে থাকলে মনে হয় যেন নিজের ছোট্ট একটা পাহাড়ি বাড়িতে আছি। 

গ্রীষ্মে এসব জায়গায় ভিড় কম থাকে, তাই শান্তিতে সময় কাটানো যায়। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, যদি আপনি লাক্সারির পেছনে অতিরিক্ত টাকা খরচ না করে ভালো স্মৃতি তৈরি করতে চান, তাহলে এই মিড-রেঞ্জ অপশনগুলো একবার চেষ্টা করে দেখুন। মিস করলে পরে অনেক পস্তাবেন।

শেষ কথাঃ লেখকের মন্তব্য

বান্দরবানের সেরা রিসোর্ট রিভিউ লিখতে গিয়ে আমার নিজের গত বছরের সেই ট্রিপের সব স্মৃতি আবার ঝাঁপিয়ে পড়েছে। পাহাড়ের ঠান্ডা হাওয়া, মেঘের সমুদ্র, ইনফিনিটি পুলে সূর্যাস্ত দেখা আর জঙ্গলের মাঝে কটেজে চুপচাপ বসে থাকার অনুভূতি সবকিছু মিলিয়ে মনে হয়েছে যে সমতলের গরম থেকে পালিয়ে এই পাহাড়ি এলাকায় এলে সত্যিই মনটা নতুন করে ভরে যায়। লাক্সারি থেকে শুরু করে বাজেটের মিড-রেঞ্জ সব ধরনের রিসোর্টের কথা যতটুকু শেয়ার করেছি, সবই আমার নিজের চোখে দেখা আর অনুভব করা অভিজ্ঞতা থেকে। 

যদি আপনার মনে হয় এই লেখা পড়ে একটা ট্রিপ প্ল্যান করবেন, তাহলে আমার এই ছোট্ট প্রচেষ্টা সার্থক। বান্দরবান আপনাকে ডাকছে, শুধু একটু সাহস করে বেরিয়ে পড়ুন, পরিবার বা বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে আসুন দেখবেন ফিরে এসে অনেকদিন এই স্মৃতি মন থেকে মুছে যাবে না। আর হ্যাঁ, আপনারা যদি ইতিমধ্যে বান্দরবান ঘুরে এসে থাকেন তাহলে কমেন্টে নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করুন, কোন রিসোর্টে থেকেছেন, কী ভালো লেগেছে সবাই মিলে আরও অনেকের উপকার হবে। বান্দরবানের পাহাড়ি হাওয়া আপনার জন্য অপেক্ষায় আছে, যান, একটু শান্তি খুঁজে নিয়ে আসুন।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

ইনফোনেস্টইনের শর্তাবলী মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট পর্যাবেক্ষন করা হয়।

comment url

Author Bio

Author
Akther Hossain

একজন ডিজিটাল মার্কেটিং এক্সপার্ট ও ইনফোনেস্টইন লিমিটেড এর সিইও। SEO, ব্লগিং, অনলাইন ইনকাম ও টেকনোলজি নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন। তার লক্ষ্য – পাঠকদের ডিজিটাল ক্যারিয়ারে সফল হতে সহায়তা করা।