অনলাইন গেম আসক্তি কমানোর উপায় কি কি
অনলাইন গেম আসক্তি কমানোর উপায় কি কি জানতে চান? অনেকেই মজা করে গেম খেলতে শুরু
করেন, কিন্তু একসময় দেখেন সময় যেন হাতের মুঠো থেকে ফসকে যাচ্ছে। ভালো খবর হলো,
কয়েকটি সহজ অভ্যাস বদলালেই এই সমস্যা অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
এই লেখায় পাবেন বাস্তবসম্মত কিছু কৌশল, যা দৈনন্দিন জীবনে সহজেই কাজে লাগানো যায়।
পড়াশোনা, কাজ ও পরিবারের জন্য সময় বের করার কার্যকর উপায়ও তুলে ধরা হয়েছে। যারা
গেমের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে চান, তাদের জন্য এটি হতে পারে একটি দরকারি
গাইড।
পেজ সূচিপত্রঃ অনলাইন গেম আসক্তি কমানোর উপায় কি কি
অনলাইন গেম আসক্তি কমানোর উপায় কি কি
অনলাইন গেম আসক্তি কমানোর উপায় কি কি-এই প্রশ্নটা আজকাল অনেক অভিভাবকের মুখে
শোনা যায়, আবার অনেক তরুণ নিজেও বুঝতে পারছে যে সে একটু বেশিই ডুবে যাচ্ছে। রাত
২টা বাজে, চোখ জ্বলছে, তবু কন্ট্রোলার ছাড়তে মন চাইছে না-এই অনুভূতিটা চেনা
লাগছে তো? হ্যাঁ, এটাই আসক্তির প্রথম ধাপ।
আপনি কি গেমের জন্য ঘুম বাদ দিচ্ছেন? পড়াশোনা বা কাজ পিছিয়ে যাচ্ছে? বন্ধুদের
সাথে দেখা হচ্ছে না? তাহলে বুঝতে হবে, সমস্যাটা শুধু "একটু বেশি গেম খেলা" না-এটা
অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। নিজের অবস্থাটা সৎভাবে বোঝাটাই প্রথম ধাপ। দিনে কত
ঘণ্টা গেম খেলবেন, সেটা আগে ঠিক করুন। মোবাইলে স্ক্রিন টাইম লিমিট সেট করুন।
শুনতে সহজ মনে হচ্ছে, কিন্তু প্রথম কয়েক দিন সত্যিই কঠিন লাগবে। তবে একবার
নিয়মটা মানা শুরু করলে, মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে মেনে নেয়। গেমের জায়গাটা খালি
রাখলে মন আবার সেখানে ফিরে যাবে। বরং সেই সময়টায় অন্য কিছু ঢুকিয়ে
দিন-ক্রিকেট, বই পড়া, সাইক্লিং, রান্না, যা-ই হোক।
আপনার মস্তিষ্ক আনন্দ চায়, সেটাকে অন্য পথে দিন। গেম ছেড়ে দেওয়াটা লক্ষ্য না,
বরং জীবনে অন্য আনন্দ যোগ করাটাই আসল কাজ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গেম আসক্তি রাতের
দিকে বেশি বাড়ে। রাত ১০টার পর ফোন বা কম্পিউটার বন্ধ রাখার অভ্যাস করুন। ঘুমের
আগে গেম খেলার অভ্যাস থাকলে, সেটা সরাসরি আসক্তি বাড়ায়। ভালো ঘুম হলে পরের দিন
গেমের টান এমনিতেই একটু কম লাগে। লুকিয়ে রাখলে সমস্যা কমে না, বরং বাড়ে। কাছের
কাউকে বলুন যে আপনি গেম কমাতে চাইছেন। সে আপনাকে মনে করিয়ে দিতে পারবে, একটু
চাপও দিতে পারবে। একা লড়াই করা কঠিন, কিন্তু পাশে কেউ থাকলে পথটা অনেক সহজ হয়ে
যায়। সবসময় না।
তবে যদি দেখেন নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না, তাহলে সাময়িকভাবে অ্যাপ ডিলিট
করা বা অ্যাকাউন্ট ডিঅ্যাক্টিভেট করা বুদ্ধিমানের কাজ। এটা দুর্বলতা না-এটা নিজের
ওপর সৎ থাকা। অনেক সময় একটু দূরত্ব তৈরি করলেই টানটা কমে আসে। যদি মনে হয় নিজে
থেকে পারছেন না, একজন কাউন্সেলর বা মনোবিদের সাথে কথা বলুন। অনলাইন গেম আসক্তি
এখন একটি স্বীকৃত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। এটা নিয়ে কথা বলতে দ্বিধা করার কিছু
নেই। সঠিক সময়ে সাহায্য নেওয়া সবচেয়ে বড় সাহসের কাজ।
গেম আসক্তির মূল কারণ
গেম খেলা শুরু হয় আনন্দের জন্য, কিন্তু একসময় সেটা আর শুধু আনন্দ থাকে না। আপনি
হয়তো খেয়াল করেননি কখন থেকে গেমটা আপনার দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে
গেছে। এই পরিবর্তনটা হঠাৎ হয় না-ধীরে ধীরে হয়, একদম চুপিচুপি। গেমের ভেতরে একটা
"রিওয়ার্ড সিস্টেম" থাকে। আপনি একটা লেভেল পার করলেন, একটা আইটেম পেলেন,
র্যাংকিংয়ে উপরে উঠলেন-মস্তিষ্ক তখনই ডোপামিন ছাড়ে। এই অনুভূতিটা এতটাই ভালো
লাগে যে বারবার সেটা পেতে ইচ্ছে করে। আর এই চক্রটাই আসক্তির শুরু। একাকীত্ব একটা
বড় কারণ। যে মানুষ বাস্তব জীবনে নিজেকে একা মনে করে, সে গেমের দুনিয়ায় সঙ্গী
খোঁজে।
আরো পড়ুনঃ ঘরে বসে অটিজম থেরাপি কার্যক্রম বাংলা
অনলাইন গেমে দলবদ্ধ হওয়ার সুযোগ থাকে, কথা বলা যায়, একসাথে লড়াই করা যায়। এই
ভার্চুয়াল বন্ধুত্ব অনেক সময় বাস্তবের শূন্যতাটা ভরাট করে দেয়-সাময়িকভাবে।
পারিবারিক চাপ বা মানসিক অস্থিরতাও গেম আসক্তি বাড়ায়। আপনি যখন পড়াশোনার চাপ,
সম্পর্কের জটিলতা বা ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ডুবে থাকেন, তখন গেমটা একটা
"পালানোর জায়গা" হয়ে ওঠে। সেখানে কোনো বাস্তব সমস্যা নেই, শুধু একটা মিশন
আছে-আর সেটা শেষ করলেই জয়। গেম ডিজাইনাররা জানেন মানুষকে কীভাবে ধরে রাখতে
হয়।
"আরেকটু খেললেই পরের লেভেল", "আজকের ডেইলি মিশন মিস করবেন না"-এই ছোট ছোট
ফাঁদগুলো আপনাকে স্ক্রিনের সামনে বসিয়ে রাখে। এটা আপনার দোষ না, এটা সিস্টেমের
ডিজাইন। কিন্তু বুঝতে পারলে, লড়াইটা একটু সহজ হয়। বয়সটাও একটা ফ্যাক্টর। কিশোর
বয়সে মস্তিষ্ক এমনিতেই উত্তেজনা এবং তাৎক্ষণিক পুরস্কারের দিকে বেশি ঝোঁকে। তখন
গেমের টানটা স্বাভাবিকভাবেই বেশি শক্তিশালী হয়। আপনি যদি তরুণ হন বা আপনার
সন্তান কিশোর বয়সে থাকে, তাহলে এই বিষয়টা একটু বেশি মনোযোগ দিয়ে দেখা দরকার।
গেম আসক্তির লক্ষণ
আপনি কি নিজেই বুঝতে পারছেন না যে গেমটা একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে? অনলাইন গেম
আসক্তি কমানোর উপায় কি কি খোঁজার আগে, আগে বুঝতে হবে আসলে আসক্তি হয়েছে কিনা।
লক্ষণগুলো চিনতে পারলেই অর্ধেক কাজ হয়ে যায়। সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ হলো সময়ের
হিসাব হারিয়ে ফেলা। আপনি ভেবেছিলেন ৩০ মিনিট খেলবেন, কিন্তু চোখ তুলে দেখলেন ৩
ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। এটা মাঝেমধ্যে হলে সমস্যা নেই, কিন্তু প্রতিদিন এমন হলে
বুঝতে হবে কোথাও একটা নিয়ন্ত্রণ নেই। ঘুমের সমস্যা একটা বড় সংকেত। রাত ১২টা,
১টা, ২টা-গেম চলছেই। সকালে উঠতে পারছেন না, ক্লাসে বা অফিসে ঝিমুচ্ছেন।
শরীর বিশ্রাম চাইছে, কিন্তু মন বলছে "আরেকটা রাউন্ড"। এই টানাটানিটা যখন
প্রতিদিনের রুটিন হয়ে যায়, তখন এটা আর স্বাভাবিক অভ্যাস না। গেম বন্ধ করতে বললে
রাগ বা বিরক্তি আসে-এটাও একটা স্পষ্ট লক্ষণ। পরিবার বা বন্ধু কিছু বললে মেজাজ
খারাপ হয়ে যায়। মনে হয় তারা কিছু বোঝে না, শুধু বাধা দিচ্ছে। এই অনুভূতিটা
আসলে নির্ভরশীলতার একটা চিহ্ন-গেমটা আপনার কাছে এখন শুধু বিনোদন না, অনেক বেশি
কিছু হয়ে গেছে। পড়াশোনা বা কাজে মনোযোগ দিতে পারছেন না? মাথায় সবসময় গেমের
কথা ঘুরছে? ক্লাসে বসে আছেন কিন্তু মন পড়ে আছে গেমের ওই অসম্পূর্ণ মিশনে।
এই "মানসিক অনুপস্থিতি" অনেক সময় বাইরে থেকে বোঝা যায় না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে
এটা পারফরম্যান্সে বড় ক্ষতি করে। বাস্তব জীবনের সম্পর্কগুলো দুর্বল হয়ে যাওয়া
আরেকটি লক্ষণ। বন্ধুরা ডাকছে, কিন্তু গেম ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না। পরিবারের
সাথে সময় কমে যাচ্ছে। আস্তে আস্তে আসল মানুষগুলো দূরে সরে যাচ্ছে, আর স্ক্রিনের
চরিত্রগুলো কাছে আসছে।
এটা যখন টের পান, তখনই সতর্ক হওয়ার সময়। শারীরিক লক্ষণও থাকে। চোখ জ্বালা করছে,
ঘাড়ে ব্যথা, পিঠ ধরে আছে-এগুলো শরীরের সংকেত। দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে বসে থাকলে
শরীর এভাবেই প্রতিবাদ করে। আপনি যদি প্রতিদিন এই ব্যথাগুলো নিয়েই গেমে বসেন,
তাহলে বুঝুন-শরীর থামতে বলছে।
অতিরিক্ত গেম খেলার ক্ষতি
অতিরিক্ত কিছুই ভালো না-এটা সবাই জানে। কিন্তু গেমের ক্ষেত্রে এই "অতিরিক্ত"
কথাটা অনেকেই গুরুত্ব দেন না। আপনি হয়তো ভাবছেন, "আরে, শুধু তো গেম
খেলছি!"-কিন্তু এই "শুধু গেম" আপনার জীবনের অনেকগুলো দিকে চুপচাপ ক্ষতি করে
যাচ্ছে। সবার আগে ক্ষতি হয় চোখের। দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখে
শুষ্কতা, জ্বালাপোড়া আর ঝাপসা দেখার সমস্যা তৈরি হয়। অল্প বয়সেই চশমার দরকার
পড়ছে অনেকের। আপনি যদি প্রতিদিন ৫-৬ ঘণ্টা স্ক্রিনে চোখ রাখেন, তাহলে চোখ দুটো
নীরবে মূল্য দিচ্ছে।
ঘাড়, কোমর আর কব্জিতে ব্যথা-এগুলো গেমারদের পরিচিত সঙ্গী। একই ভঙ্গিতে ঘণ্টার পর
ঘণ্টা বসে থাকলে মেরুদণ্ডে চাপ পড়ে। কব্জিতে "কার্পাল টানেল সিন্ড্রোম" হওয়ার
ঝুঁকি থাকে, যেটা একটা বেদনাদায়ক স্নায়ু সমস্যা। এই ব্যথাগুলো শুরুতে ছোট মনে
হয়, পরে বড় আকার নেয়। মানসিক স্বাস্থ্যেও গভীর প্রভাব পড়ে। গেমে হারলে হতাশা
আসে, জিতলে আবার আরও খেলার তৃষ্ণা জাগে-এই আবেগের উঠানামা মস্তিষ্ককে ক্লান্ত করে
দেয়। ধীরে ধীরে উদ্বেগ আর বিরক্তিভাব বাড়তে থাকে। অনেকে বুঝতেই পারেন না যে
মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়ার পেছনে গেমের একটা বড় ভূমিকা আছে।
আরো পড়ুনঃ মশার কামড়ের দাগ দূর করার ঘরোয়া উপায়
পড়াশোনা বা ক্যারিয়ারে ক্ষতি হয় সবচেয়ে চুপচাপ। আজকের পড়াটা কাল পড়বেন, কাল
মিটিংয়ের প্রস্তুতি পরশু নেবেন-এভাবে একটু একটু করে পিছিয়ে পড়তে থাকেন।
পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হয়, কাজে মনোযোগ কমে যায়। আর এই ক্ষতিটা বুঝতে বুঝতে অনেক
দেরি হয়ে যায়। সামাজিক জীবনও ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে আসে। বন্ধুদের সাথে আড্ডা,
পরিবারের সাথে সময়-সব কিছু গেমের কাছে হেরে যায়। একসময় আপনি দেখবেন, আশেপাশের
মানুষগুলো দূরে সরে গেছে।
ভার্চুয়াল দুনিয়ায় যত বন্ধু বাড়ছে, বাস্তব জীবনে তত একা হয়ে যাচ্ছেন। ঘুমের
চক্র ভেঙে যাওয়া আরেকটি বড় সমস্যা। রাত জেগে গেম খেললে শরীরের স্বাভাবিক ঘুমের
ছন্দ নষ্ট হয়। ঘুম কম হলে স্মৃতিশক্তি কমে, মেজাজ খারাপ থাকে, রোগ প্রতিরোধ
ক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়ে। শরীর একটা যন্ত্র না-এটাকে বিশ্রাম না দিলে একসময়
ভেঙে পড়বেই।
গেম খেলার সময় নিয়ন্ত্রণ
সময় নিয়ন্ত্রণ মানে গেম ছেড়ে দেওয়া না-মানে হলো গেমকে তার জায়গায় রাখা।
আপনি যদি আগে থেকে ঠিক করে নেন কখন খেলবেন আর কখন থামবেন, তাহলে গেম আর আপনাকে
নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। এই ছোট্ট সিদ্ধান্তটাই আসলে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন
আনে।প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময়সীমা ঠিক করুন। ধরুন, বিকেল ৫টা থেকে ৬টা-এই এক
ঘণ্টাই গেমের জন্য। টাইমার সেট করুন, আর টাইমার বাজলে সত্যিই উঠে পড়ুন। প্রথম
কয়েকদিন কঠিন লাগবে, কিন্তু মস্তিষ্ক অভ্যাসের দাস-একবার রুটিন হয়ে গেলে এটা আর
কষ্টের মনে হবে না।
খাওয়া, পড়াশোনা বা ঘুমের সময়টাকে কখনো গেমের সাথে মেশাবেন না। এই তিনটা সময়
আপনার শরীর আর মনের জন্য-এগুলো আপস করার জায়গা না। যে মুহূর্তে গেম এই সময়গুলো
গ্রাস করতে শুরু করে, বুঝবেন নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। সপ্তাহে একদিন
"গেম-ফ্রি ডে" রাখুন-এই একটা অভ্যাসই অনলাইন গেম আসক্তি কমানোর উপায় কি কি
খুঁজতে থাকা মানুষদের জীবন বদলে দিয়েছে। সেদিন বাইরে যান, বই পড়ুন বা বন্ধুর
সাথে সময় কাটান। দেখবেন গেম ছাড়াও দিন কাটানো যায়, বরং সেদিনটা অনেক বেশি
রিফ্রেশিং লাগবে।
দৈনন্দিন রুটিনে পরিবর্তন
রুটিন বদলানো মানে জীবন উলটে দেওয়া না। ছোট ছোট পরিবর্তনই আসলে বড় ফলাফল আনে।
আপনি যদি প্রতিদিনের অভ্যাসে একটু সচেতনভাবে কিছু যোগ-বিয়োগ করেন, তাহলে গেমের
টানটা এমনিতেই কমে আসতে শুরু করে। সকালটা ভালোভাবে শুরু করুন। ঘুম থেকে উঠেই ফোন
হাতে নেওয়ার অভ্যাসটা বাদ দিন। একটু হাঁটুন, পানি খান, হালকা ব্যায়াম করুন।
সকালের প্রথম ৩০ মিনিট যদি স্ক্রিন ছাড়া কাটাতে পারেন, পুরো দিনটাই অনেক বেশি
গোছানো লাগবে। দিনের মাঝে কিছু "অফলাইন সময়" রাখুন। বিকেলে একটু বাইরে যান,
রান্না শিখুন, গান শুনুন বা বই হাতে নিন।
এই সময়গুলো আপনার মস্তিষ্ককে একটু শ্বাস নিতে দেয়। গেমের বাইরেও যে আনন্দ আছে,
শরীর আর মন সেটা আবার চিনতে শেখে। রাতের রুটিনটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ঘুমানোর
অন্তত এক ঘণ্টা আগে সব স্ক্রিন বন্ধ রাখুন। এই সময়টায় হালকা কিছু পড়ুন বা
পরিবারের সাথে কথা বলুন। ঘুমটা ভালো হলে পরের দিন মাথা পরিষ্কার থাকে, আর গেমের
প্রতি আকর্ষণটাও অনেকটা কমে আসে। সপ্তাহের শুরুতে একটা সহজ পরিকল্পনা করুন। কোন
দিন কী করবেন, কখন পড়বেন, কখন বিশ্রাম নেবেন-এটুকু ঠিক করে রাখলেই অনেক।
পরিকল্পনা থাকলে ফাঁকা সময়ে গেমের দিকে হাত যাওয়ার সুযোগ কমে যায়। আর ফাঁকা
সময়ই আসলে আসক্তির সবচেয়ে বড় সুযোগ।
পরিবার ও বন্ধুদের ভূমিকা
অনলাইন গেম আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসার পথে পরিবার ও বন্ধুদের সহযোগিতা অনেক বড়
ভূমিকা রাখে। আপনি যদি একা একা এই অভ্যাস কমানোর চেষ্টা করেন, তাহলে অনেক সময়
মাঝপথে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন। কাছের মানুষের সমর্থন সেই পথটাকে অনেক সহজ করে
দেয়। পরিবারের সদস্যরা যদি আপনার সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেন, তাহলে সমস্যাটি বোঝা
এবং সমাধান খুঁজে পাওয়া সহজ হয়। অনেকেই মনে করেন বকাঝকা করলে গেম খেলা কমে
যাবে। বাস্তবে এতে উল্টো দূরত্ব বাড়তে পারে। সহানুভূতি এবং ধৈর্য এখানে বেশি
কার্যকর।
আপনি যখন ভাবছেন অনলাইন গেম আসক্তি কমানোর উপায় কি কি, তখন পরিবারকে পাশে পাওয়া
সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। তারা আপনার দৈনন্দিন রুটিনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সাহায্য
করতে পারে। ছোট ছোট অভ্যাস বদলানোর কাজটাও তখন সহজ মনে হয়। বন্ধুরাও এই ক্ষেত্রে
গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আপনার বন্ধুদের বেশিরভাগ সময় যদি অনলাইন গেম
নিয়ে কাটে, তাহলে সেই পরিবেশ থেকে বের হওয়া কঠিন হয়ে যায়। তাই এমন বন্ধুদের
সঙ্গে সময় কাটানো ভালো, যারা নতুন কিছু শেখা বা সৃজনশীল কাজে উৎসাহ দেয়।
পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে খাওয়া, ঘুরতে যাওয়া বা গল্প করার মতো সাধারণ কাজগুলোও
বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এসব মুহূর্ত আপনাকে বাস্তব জীবনের সম্পর্কগুলোর মূল্য
আবার অনুভব করায়। তখন ভার্চুয়াল জগতের প্রতি অতিরিক্ত আকর্ষণ ধীরে ধীরে কমতে
শুরু করে। বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা, আড্ডা বা কোনো শখভিত্তিক কার্যক্রমে অংশ নিলে
মন ভালো থাকে। এতে অবসর সময় কাটানোর জন্য গেমই একমাত্র ভরসা হয়ে থাকে না। নতুন
অভিজ্ঞতা তৈরি হলে গেম খেলার তাগিদও অনেকটাই কমে যায়।
সবশেষে বলা যায়, গেম আসক্তি কমানোর লড়াই শুধু একজন মানুষের একার যুদ্ধ নয়।
পরিবার এবং বন্ধুদের আন্তরিক সহযোগিতা থাকলে এই পরিবর্তন অনেক সহজ ও স্থায়ী হয়।
অনেক সময় একটি উৎসাহের বাক্যও মানুষকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে।
স্বাস্থ্যকর বিকল্প অভ্যাস
গেম ছাড়লেই সেই সময়টা খালি পড়ে থাকে-আর খালি সময় আবার গেমের দিকে টানে। তাই
শুধু ছাড়লেই হবে না, সেই জায়গাটায় অন্য কিছু ভরাট করতে হবে। আপনি যদি মনের মতো
একটা বিকল্প অভ্যাস খুঁজে পান, তাহলে গেমের টানটা এমনিতেই দুর্বল হয়ে যায়।
শরীরচর্চা সবচেয়ে কার্যকর বিকল্পগুলোর একটা। সকালে ৩০ মিনিট হাঁটা, সাইক্লিং বা
হালকা ব্যায়াম-এটুকুই যথেষ্ট। ব্যায়ামের পর শরীরে যে হালকা অনুভূতি আসে, সেটা
গেমের ডোপামিনের চেয়ে অনেক বেশি স্থায়ী। আপনার মস্তিষ্ক একবার এই পার্থক্যটা
টের পেলে, নিজেই ভালো দিকটা বেছে নিতে চাইবে।
বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করুন। শুরুতে মোটা বই না, একটা গল্পের বই বা যেকোনো বিষয়ে
আগ্রহ আছে এমন কিছু দিয়ে শুরু করুন। বই একবার টানতে শুরু করলে, স্ক্রিনের চেয়ে
এটা অনেক বেশি মনোযোগ ধরে রাখে। পড়ার অভ্যাস মাথাকে সক্রিয় রাখে, আর গেমের
ফাঁকা উত্তেজনার বদলে একটা গভীর তৃপ্তি দেয়। নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করুন।
গিটার, রান্না, ছবি আঁকা, ফটোগ্রাফি-যেটাতে একটু হলেও আগ্রহ আছে। নতুন দক্ষতা
শেখার সময় মস্তিষ্ক ব্যস্ত থাকে, আর অর্জনের আনন্দও পাওয়া যায়।
গেমে লেভেল আপ করার যে অনুভূতি, বাস্তব জীবনে কিছু শেখার অনুভূতিটা তার চেয়ে
অনেক বেশি গভীর। বন্ধু বা পরিবারের সাথে সময় কাটানোটাকে আবার অগ্রাধিকার দিন।
সপ্তাহে একদিন বাইরে যান, আড্ডা দিন, একসাথে খান। বাস্তব মানুষের সাথে কথা বলার
যে উষ্ণতা, সেটা কোনো অনলাইন গেমের চ্যাট কখনো দিতে পারবে না। এই সম্পর্কগুলো
আবার গড়ে তুললে, স্ক্রিনের প্রতি নির্ভরশীলতা এমনিতেই কমতে থাকে।
শিশুদের গেম আসক্তি কমানো
আপনি যদি জানতে চান অনলাইন গেম আসক্তি কমানোর উপায় কি কি, তাহলে শিশুদের ক্ষেত্রে
শুরু থেকেই সঠিক নিয়ম তৈরি করা জরুরি। ছোটবেলায় গড়ে ওঠা অভ্যাসই ভবিষ্যতে বড়
প্রভাব ফেলে। তাই সময়মতো সচেতন হওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে শুধু গেম
থেকে দূরে রাখতে বললেই হবে না। বরং খেলাধুলা, বই পড়া বা সৃজনশীল কাজে অংশ নিতে
উৎসাহ দিন। এতে তার অবসর সময় আরও আনন্দদায়ক এবং অর্থবহ হয়ে উঠবে।
মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা ভালো অভ্যাস।
আপনি যদি নিয়মিত সেই সময় পর্যবেক্ষণ করেন, তাহলে শিশুর গেম খেলার প্রবণতা ধীরে
ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিশুর সঙ্গে
বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। সে কী খেলছে, কেন খেলছে এবং কত সময় দিচ্ছে তা
জানার চেষ্টা করুন। খোলামেলা আলোচনা অনেক সময় কঠোর নিষেধাজ্ঞার চেয়েও বেশি
কার্যকর হয়।
শেষ কথাঃ আসক্তিমুক্ত থাকার উপায়
আসক্তিমুক্ত থাকা মানে একদিনে সব বদলে ফেলা না। এটা একটা ধীর প্রক্রিয়া, আর এই
পথে হোঁচট খাওয়াটাও স্বাভাবিক। আপনি যদি আজ থেকে শুধু একটা ছোট পদক্ষেপ নেন,
সেটাই যথেষ্ট শুরু। নিজেকে দোষ দেওয়া বন্ধ করুন। গেমে আসক্ত হওয়া আপনার
চরিত্রের দোষ না, এটা একটা মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা। অনেকেই এই পথ পার করেছে এবং
ফিরে এসেছে। আপনিও পারবেন-শুধু নিজের উপর একটু বিশ্বাস রাখতে হবে।
প্রতিদিন ছোট ছোট জয় উদযাপন করুন। আজ এক ঘণ্টা কম খেললেন-এটা একটা জয়। গেম-ফ্রি
একটা সন্ধ্যা কাটালেন এটাও জয়। এই ছোট অর্জনগুলো আপনাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে
যাওয়ার শক্তি দেবে, হতাশার মুহূর্তে আঁকড়ে ধরার কিছু দেবে। পরিবর্তনটা ধরে
রাখতে হলে আশেপাশের পরিবেশও বদলাতে হবে। যারা আপনাকে ভালো রাখতে চায়, তাদের কাছে
রাখুন। যে বন্ধুরা শুধু গেমের জন্য ডাকে, তাদের সাথে একটু দূরত্ব রাখুন-অন্তত
শুরুর দিকে।
পরিবেশ ঠিক থাকলে মন ঠিক থাকা অনেক সহজ হয়। শেষ পর্যন্ত একটাই কথা-আপনার জীবনটা
একটা গেম না, এখানে কোনো রিস্টার্ট নেই। প্রতিটা দিন, প্রতিটা মুহূর্ত একবারই
আসে। গেমের স্ক্রিনের বাইরে একটা পুরো জীবন অপেক্ষা করছে-বন্ধু, স্বপ্ন, সম্পর্ক,
সাফল্য। সেই জীবনটা বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তটা শুধু আপনারই।



ইনফোনেস্টইনের শর্তাবলী মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট পর্যাবেক্ষন করা হয়।
comment url