বাসায় টিয়া পাখি পোষ মানানোর সহজ উপায়
বাসায় টিয়া পাখি পোষ মানানোর সহজ উপায় জানতে চান? নতুন টিয়া বারবার কামড়ায়,
ডাকে বা কাছে আসতে না চাইলে কী করবেন, তা ধাপে ধাপে সহজ ভাষায় জানুন। ভালোবাসা,
ধৈর্য আর কিছু ছোট কৌশলেই পাখি ধীরে ধীরে আপনাকেই সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস
করবে।
অনেকেই বছরের পর বছর যে ভুল করে বসেন, আপনি যেন সেই ভুল না করেন-সেই দিকেও নজর
রাখা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত পড়লে এমন কিছু বাস্তব টিপস জানতে পারবেন, যা আপনার
টিয়া পাখিকে দ্রুত বন্ধুসুলভ করে তুলতে সাহায্য করবে।
পেজ সুচিপত্রঃ বাসায় টিয়া পাখি পোষ মানানোর সহজ উপায়
বাসায় টিয়া পাখি পোষ মানানোর সহজ উপায়
বাসায় টিয়া পাখি পোষ মানানোর সহজ উপায় খুঁজতে গিয়ে অনেকেই হিমশিম খেয়ে যান।
ভাবেন, পাখিটা বুঝি বশ মানবে না। আসলে ব্যাপারটা এত কঠিন নয়। একটু ধৈর্য, একটু
ভালোবাসা, ব্যস, কেল্লাফতে। আমার এক বন্ধু গত বছর একটা টিয়া কিনল। প্রথম
কয়েকদিন পাখিটা খাঁচার কোণে জড়সড় হয়ে বসে থাকত। কাছে গেলেই ভয়ে ডানা ঝাপটাত।
বন্ধু হতাশ হয়ে আমাকে ফোন করল। আমি ওকে প্রথমেই বললাম, তাড়াহুড়ো করো না। নতুন
পাখি নতুন জায়গায় ভয় পাবেই, এটাই স্বাভাবিক। ওকে অন্তত এক সপ্তাহ সময় দাও
নিজের ঘরটাকে চিনে নিতে। আপনিও যদি নতুন টিয়া এনে থাকেন, একই কাজ করুন। প্রথম
কাজটা হলো পরিচয় গড়ে তোলা।
খাঁচার পাশে বসে নরম গলায় কথা বলুন। রোজ একই সময়ে খাবার দিন। পাখি যখন বুঝবে
আপনি ওর ক্ষতি করবেন না, তখন নিজেই কাছে আসতে শুরু করবে। খাবার এখানে জাদুর কাঠির
মতো কাজ করে। হাতে একটু কাঁচা মরিচ বা পেয়ারার টুকরো নিন। খাঁচার শিকের ফাঁক
দিয়ে বাড়িয়ে দিন। প্রথমে পাখি খাবে না। কিন্তু দিন কয়েক পর ঠিকই ঠোঁট
বাড়াবে। এবার আসে হাতে বসানোর পালা। ধীরে ধীরে খাঁচার ভেতর হাত ঢোকান, কোনো
তাড়া নেই। আঙুলটা ওর পায়ের কাছে আলতো করে ঠেকান। কয়েকবারের চেষ্টায় পাখি
আপনার আঙুলে উঠে বসবে। সেই মুহূর্তের আনন্দ ভাষায় বোঝানো যায় না। কথা শেখানোর
শখ থাকলে সেটাও কঠিন কিছু নয়।
রোজ একটা-দুটো শব্দ বারবার বলুন, যেমন "মিঠু" বা "আসো"। একই শব্দ একই সুরে বলবেন।
টিয়া নকল করতে ওস্তাদ, ধীরে ধীরে ও ঠিক ধরে ফেলবে। তবে একটা কথা মাথায় রাখবেন,
কখনো ধমক দেবেন না বা জোর করবেন না। ভয় পেলে পাখি খোলস ছেড়ে বেরোবে না।
ভালোবাসা দিয়ে যা হয়, শাসন দিয়ে তা কখনো হয় না। শেষ কথা হলো, নিয়ম আর মায়া,
এই দুটোই আসল চাবিকাঠি। রোজ একটু সময় দিন, ওর সাথে গল্প করুন, খেলুন। দেখবেন
কিছুদিনের মধ্যেই আপনার টিয়া আপনার সবচেয়ে আদরের বন্ধু হয়ে উঠেছে।
নতুন টিয়া পাখির যত্ন
নতুন একটা টিয়া বাসায় আনলেন, মনটা খুশিতে ভরে গেল। কিন্তু সাথে সাথে একটা
চিন্তাও মাথায় ঘুরপাক খায়, এখন এর যত্ন নেব কীভাবে? চিন্তা করবেন না। ছোট ছোট
কয়েকটা নিয়ম মানলেই আপনার পাখিটা তরতাজা আর সুখী থাকবে। প্রথম কয়েকটা দিন
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নতুন জায়গা, নতুন মুখ, পাখিটা ভয়ে জড়সড় হয়ে থাকবে।
ওকে একটু নিরিবিলি জায়গায় রাখুন, যেখানে হইচই কম। এই সময়টায় বেশি ঘাঁটাঘাঁটি
না করে শুধু দূর থেকে খেয়াল রাখুন। খাঁচাটা যেন যথেষ্ট বড় হয়। পাখি যেন ডানা
মেলে একটু নড়াচড়া করতে পারে। খাঁচার ভেতর দুটো কাঠি রাখুন বসার জন্য, আর
পরিষ্কার পানির পাত্র। রোজ পানি বদলে দিতে ভুলবেন না।
খাবারের দিকে বাড়তি নজর দিন। শুধু ধান বা বীজ দিলেই হবে না। সাথে দিন তাজা ফল,
যেমন পেয়ারা, আপেল বা কলা। মাঝে মাঝে কাঁচা মরিচ আর সবুজ শাক দিন, এতে পাখির
শরীর চাঙা থাকবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এখানে সবচেয়ে বড় কথা। নোংরা খাঁচায়
পাখি অসুস্থ হয়ে পড়ে চটজলদি। রোজ খাঁচার তলার কাগজ বদলান, খাবারের পাত্র ধুয়ে
দিন। সপ্তাহে একদিন পুরো খাঁচাটা ভালো করে ধুয়ে ফেলুন। টিয়া পাখি গোসল করতে
ভীষণ ভালোবাসে। সপ্তাহে দু-তিনবার একটা ছোট পাত্রে পরিষ্কার পানি দিন। দেখবেন
কেমন মজা করে ডানা ঝাপটে গা ভেজাচ্ছে। গোসলের পর নরম রোদে একটু বসতে দিন।
পাখির শরীরের দিকে চোখ রাখুন রোজ। পালক ফুলে আছে কি না, খাওয়া কমে গেছে কি না,
চোখ-নাক দিয়ে পানি পড়ছে কি না। এসব ছোট লক্ষণই বড় অসুখের আগাম বার্তা দেয়।
সন্দেহ হলে দেরি না করে পাখির ডাক্তার দেখান। সবশেষে বলি, পাখিকে একা রাখবেন না
বেশিক্ষণ। টিয়া বড্ড মিশুক প্রাণী, একা থাকলে মনমরা হয়ে যায়। রোজ একটু সময়
দিন, নরম গলায় কথা বলুন, খেলুন। আপনার আদর পেলে পাখিটা ধন্য হয়ে যাবে। মনে
রাখবেন, যত্নের কোনো বিকল্প নেই। আপনি যতটা মায়া দেবেন, পাখিটাও ততটাই ভালোবাসা
ফিরিয়ে দেবে। ছোট এই প্রাণীটাই একদিন আপনার ঘরের সবচেয়ে প্রিয় সদস্য হয়ে
উঠবে।
টিয়া পাখির বিশ্বাস অর্জন
একটা টিয়া পাখিকে হাতের কাছে টানতে হলে আগে ওর মন জয় করতে হয়। মুখে বললেই তো
আর পাখি বিশ্বাস করে না। এই বিশ্বাসটা গড়ে তুলতে হয় এক ফোঁটা এক ফোঁটা করে। আর
এর জন্য চাই অসীম ধৈর্য। ভাবুন তো, আপনাকে হুট করে অচেনা এক জায়গায় ফেলে দেওয়া
হলো। আপনিও তো ভয়ে সিঁটিয়ে যাবেন, তাই না? পাখির অবস্থাটাও ঠিক তেমন। তাই প্রথম
দিনগুলোতে ওকে জোর করবেন না একদম। আসলে বাসায় টিয়া পাখি পোষ মানানোর সহজ উপায়
লুকিয়ে আছে এই বিশ্বাসের ভেতরেই। পাখি যতক্ষণ আপনাকে বিপদ ভাববে, ততক্ষণ কাছে
আসবে না। তাই ধীরে ধীরে ওকে বোঝান, আপনি ওর বন্ধু, শত্রু নন।
আরো পড়ুনঃ মাসিকের সময় অতিরিক্ত দুর্বল লাগলে করণীয়
শুরুটা হোক গলার স্বর দিয়ে। রোজ খাঁচার পাশে বসে নরম সুরে কথা বলুন। কোনো তাড়া
নেই, কোনো জোর নেই। পাখি ধীরে ধীরে আপনার কণ্ঠস্বরের সাথে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে, ভয়
কেটে যাবে। এবার খাবারকে কাজে লাগান। হাতে একটু প্রিয় খাবার নিয়ে খাঁচার কাছে
ধরুন। প্রথমে পাখি সন্দেহের চোখে তাকাবে, খাবে না। কিন্তু ক্ষুধা আর কৌতূহল
একসময় ভয়কে হার মানায়, ঠিকই ঠোঁট বাড়াবে। হাত থেকে খাবার খাওয়া মানে অর্ধেক
যুদ্ধ জয়। এই পর্যায়ে এসে হাত সরিয়ে নেবেন না হঠাৎ করে। স্থির হয়ে বসে থাকুন।
পাখি বুঝবে আপনার হাত মানেই ভরসা, ভয়ের কিছু নেই। তবে ভুলেও তাড়াহুড়ো করবেন
না। একদিন বিশ্বাস ভাঙলে তা আবার গড়তে অনেক সময় লাগে।
উঁচু গলা, হঠাৎ নড়াচড়া বা ধমক, এসব পাখির মন থেকে আপনাকে দূরে সরিয়ে দেবে
নিমেষে। মনে রাখবেন, বিশ্বাস একটা কোমল সুতোর মতো, খুব সহজেই ছিঁড়ে যায়। তাই
প্রতিটা পদক্ষেপ ফেলুন মেপে মেপে। রোজ একটু একটু করে সময় দিন, দেখবেন পাখি নিজেই
আপনার কাঁধে এসে বসছে। শেষমেশ এটাই সত্যি, ভালোবাসার কোনো শর্টকাট নেই। আপনি যতটা
মায়া আর ধৈর্য ঢালবেন, পাখিটাও ঠিক ততটাই আপন হবে। সেই দিনটার অপেক্ষায় থাকুন,
যেদিন আপনার টিয়া নিঃসংকোচে আপনার হাতে এসে বসবে।
টিয়া পাখির প্রিয় খাবার
টিয়া পাখিকে খুশি রাখতে চান? তাহলে আগে ওর পেটের খবর রাখুন। মুখরোচক খাবার পেলে
এই পাখি আনন্দে ডগমগ। আর ঠিক খাবারই কিন্তু ওর শরীর তরতাজা রাখার আসল চাবিকাঠি।
প্রথমেই আসে বীজ আর দানার কথা। ধান, গম, ভুট্টা আর সূর্যমুখীর বীজ টিয়ার ভীষণ
পছন্দ। তবে শুধু বীজ খাওয়ালে চলবে না, এতে পাখি মোটা হয়ে যায়। তাই বীজকে রাখুন
খাবারের একটা অংশ হিসেবে, পুরোটা নয়। ফলের কথা উঠলে টিয়ার জিভে জল আসে।
পেয়ারা, আপেল, কলা, বেদানা, এসব দিলে পাখি লুফে নেবে। আপেলের বীজটা কিন্তু ফেলে
দেবেন, ওতে বিষ থাকে। ফল সবসময় ছোট টুকরো করে কেটে দিন। সবুজ শাকসবজিও রাখুন
রোজকার খাবারে।
পালং শাক, ধনেপাতা, গাজর, শসা, এগুলো পাখির শরীরে ভিটামিন জোগায়। কাঁচা মরিচ তো
টিয়ার সবচেয়ে প্রিয়, এটা খেলে ওর হজমও ভালো হয়। মাঝে মাঝে একটু বৈচিত্র্য
আনুন খাবারে। সেদ্ধ ডিমের সামান্য অংশ বা ভেজানো ছোলা দিতে পারেন। এতে পাখি
দরকারি প্রোটিন পায়। তবে পরিমাণে অল্প দেবেন, বেশি দিলে হিতে বিপরীত হবে। কিছু
খাবার আবার একদম বিষের সমান, ভুলেও দেবেন না। চকলেট, কফি, লবণাক্ত বা ভাজাপোড়া
খাবার পাখির জন্য মারাত্মক। অ্যাভোকাডোও দেবেন না কখনো, এটা টিয়ার প্রাণ পর্যন্ত
কেড়ে নিতে পারে। পানির কথা যেন ভুলে না যাই। রোজ পরিষ্কার, তাজা পানি দিন
খাঁচায়। নোংরা পানি থেকে পাখি অসুস্থ হয় চটজলদি।
তাই দিনে অন্তত একবার পানির পাত্র ধুয়ে নতুন পানি ভরে দিন। সবশেষে একটা কথা মনে
রাখবেন, ভারসাম্যই আসল কথা। শুধু একরকম খাবার নয়, বীজ-ফল-শাক সব মিলিয়ে দিন।
বৈচিত্র্যময় খাবার পেলে আপনার টিয়া থাকবে সুস্থ, সবল আর প্রাণচঞ্চল।
হাতে ওঠার প্রশিক্ষণ
টিয়া পাখিকে হাতে ওঠানো, এটাই যেন সবচেয়ে বড় স্বপ্ন প্রতিটি পাখিপ্রেমীর।
কিন্তু এই কাজটা একদিনে হয় না। ধাপে ধাপে, ধৈর্য ধরে এগোতে হয়। তাড়াহুড়ো
করলেই বরং সব ভেস্তে যাবে। শুরুর আগে নিশ্চিত হয়ে নিন, পাখি আপনাকে ভয় পাচ্ছে
কি না। যদি এখনো ভয় থাকে, তাহলে আগে বিশ্বাসটা গড়ে তুলুন। বিশ্বাস ছাড়া হাতে
ওঠার প্রশিক্ষণ কখনোই সফল হবে না। বস্তুত এই ধাপেই লুকিয়ে বাসায় টিয়া পাখি পোষ
মানানোর সহজ উপায় এর গোড়ার কথা। এবার আসল কাজে নামুন, তবে ধীর পায়ে। খাঁচার
দরজা খুলে ধীরে ধীরে হাত ভেতরে ঢোকান। কোনো ঝটকা নয়, কোনো শব্দ নয়। পাখি যেন
আপনার হাতকে বিপদ না ভাবে, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
আঙুলটা আলতো করে পাখির বুকের ঠিক নিচে, পায়ের কাছে ঠেকান। টিয়া স্বভাবতই একটু
উঁচু জায়গায় উঠতে চায়। তাই আঙুলটা সিঁড়ির মতো লাগবে ওর কাছে। আস্তে করে চাপ
দিলে ও নিজেই পা তুলে দেবে। প্রথমবার হয়তো উঠবে না, ভয়ে সরে যাবে। হতাশ হবেন না
একদম। এই খেলা রোজ কয়েকবার করে চালিয়ে যান। "উঠো" বা "আসো" বলে একটা শব্দও
শিখিয়ে দিন সাথে সাথে। ধীরে ধীরে পাখি আঙুলে উঠতে শিখবে। প্রথমে খাঁচার ভেতর,
তারপর দরজার কাছে, শেষে খাঁচার বাইরে। প্রতিটা সফল চেষ্টার পর ওকে একটু প্রিয়
খাবার দিন। এই পুরস্কারই ওকে বারবার হাতে উঠতে উৎসাহ দেবে। মনে রাখবেন, ভুলেও
পাখিকে খপ করে ধরবেন না।
জোর করে ধরলে পাখি চিরতরে হাতকে ভয় পেতে শুরু করবে। যা এতদিনে গড়লেন, তা
মুহূর্তেই ভেঙে পড়বে। ধৈর্যই এখানে আসল হাতিয়ার। কিছুদিন এভাবে চলার পর দেখবেন
এক অদ্ভুত পরিবর্তন। আপনি হাত বাড়ালেই পাখি নিজে থেকে টুক করে উঠে বসছে। সেই
মুহূর্তের খুশি সত্যিই বলে বোঝানো যায় না। মনে হবে, সব পরিশ্রম সার্থক। শেষ কথা
একটাই, লেগে থাকুন আর ভালোবাসা দিন। ধৈর্য যার আছে, টিয়া তার হাতেই ধরা দেয়।
কিছুদিন পর এই ছোট্ট পাখিটাই হয়ে উঠবে আপনার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী।
টিয়া পাখিকে কথা শেখানো
টিয়া পাখি কথা বলবে, এই ভেবেই তো অনেকে পাখিটা কিনে আনেন। আর সত্যিই, টিয়া নকল
করতে একেবারে ওস্তাদ। তবে কথা শেখানোর জন্য চাই লেগে থাকার মানসিকতা। রাতারাতি
কেউ বুলি ফোটে না। শুরুটা করুন সহজ শব্দ দিয়ে। "মিঠু", "আসো" বা নিজের নাম, এমন
ছোট শব্দ বেছে নিন। কঠিন বাক্য দিয়ে শুরু করলে পাখি ধরতে পারবে না। এক-দুই
অক্ষরের শব্দই পাখির জন্য সবচেয়ে সহজ। একটা কথা মাথায় গেঁথে নিন, পুনরাবৃত্তিই
এখানে মূল মন্ত্র। একই শব্দ, একই সুরে, দিনে বহুবার বলুন। পাখি কান পেতে শোনে,
তারপর মনে গেঁথে নেয়। ধীরে ধীরে সেই শব্দই ওর মুখে ফুটে ওঠে। সময়টাও বেছে নিন
বুদ্ধি করে। সকালবেলা পাখি থাকে চনমনে আর মনোযোগী।
এই সময় কথা শেখালে সবচেয়ে ভালো ফল মেলে। ঘরে হইচই কম থাকলে পাখির মনোযোগও থাকে
বেশি। আপনার গলার স্বরটা রাখুন স্পষ্ট আর প্রাণবন্ত। একঘেয়ে সুরে বললে পাখি
আগ্রহ হারায়। একটু উৎসাহ নিয়ে, খুশি খুশি গলায় বলুন। পাখি আপনার আবেগটাও
কিন্তু ঠিক ধরে ফেলে। পাখি যখন প্রথম শব্দটা বলবে, খুশিতে ওকে বাহবা দিন। মাথায়
হাত বুলিয়ে দিন বা একটু প্রিয় খাবার দিন। এই পুরস্কার পেলে পাখি বুঝবে, কাজটা
করে সে খুশি করেছে আপনাকে। ফলে বারবার বলতে চাইবে। তাড়াহুড়ো বা বকাঝকা এখানে
একদম নিষিদ্ধ। পাখি শব্দ না বললে রাগ করবেন না।
আরো পড়ুনঃ বারান্দায় শসা চাষ করার সঠিক নিয়ম
প্রতিটা পাখির শেখার গতি আলাদা। কেউ সপ্তাহখানেকে শেখে, কারও লাগে কয়েক মাস।
ধৈর্য হারালেই সব মাটি। শেষ কথা হলো, ভালোবাসা মিশিয়ে শেখান। পাখির সাথে যত সময়
কাটাবেন, ও তত দ্রুত আপনার ভাষা রপ্ত করবে। একদিন যখন আপনার টিয়া মিষ্টি সুরে
আপনার নাম ধরে ডাকবে, সেই আনন্দ হবে অতুলনীয়।
দৈনন্দিন পরিচর্যার নিয়ম
টিয়া পাখি পুষতে গেলে রোজকার একটা রুটিন মেনে চলতেই হয়। এলোমেলোভাবে যত্ন নিলে
পাখি সুস্থ থাকে না। ছোট ছোট কিছু কাজ, কিন্তু নিয়ম করে করতে হয় প্রতিদিন। এই
নিয়মই আপনার পাখিকে রাখবে হাসিখুশি। দিনের শুরুটা হোক পাখির খাঁচা দিয়ে। সকালে
উঠে আগে খাঁচার তলার নোংরা কাগজ বদলে দিন। খাবারের পাত্র খালি করে ধুয়ে নিন ভালো
করে। রাতের জমা ময়লা পরিষ্কার করলে পাখি রোগবালাই থেকে দূরে থাকে। আসলে দৈনন্দিন
এই ছোট অভ্যাসগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাসায় টিয়া পাখি পোষ মানানোর সহজ উপায়।
রোজ একই সময়ে খাবার দিন, একই সময়ে পরিষ্কার করুন। পাখি এই নিয়মে অভ্যস্ত হয়ে
গেলে নিজেই স্বস্তি বোধ করে। নিয়মই ওর ভরসার জায়গা।
খাবার আর পানির দিকে খেয়াল রাখুন দিনে কয়েকবার। সকালে তাজা খাবার দিন, বিকেলে
একবার দেখে নিন কমেছে কি না। পানির পাত্রটা যেন কখনো খালি বা নোংরা না থাকে।
তৃষ্ণার্ত পাখি চটজলদি দুর্বল হয়ে পড়ে। পাখির শরীর আর আচরণ রোজ একটু নজরে
রাখুন। ও কি চনমনে আছে, নাকি ঝিমিয়ে আছে? খাওয়া ঠিকঠাক হচ্ছে তো? এই ছোট
লক্ষণগুলোই আপনাকে আগেভাগে বিপদের আভাস দেবে। রোদ আর আলো-বাতাসও পাখির জন্য
জরুরি। রোজ কিছুক্ষণ খাঁচাটা নরম রোদে রাখুন। কড়া রোদ নয় কিন্তু, তাতে পাখি
কষ্ট পাবে। সকালের মিষ্টি রোদই পাখির হাড় আর পালকের জন্য সবচেয়ে ভালো। সন্ধ্যার
পর পাখিকে বিশ্রামের সুযোগ দিন।
খাঁচার ওপর হালকা একটা কাপড় ঢেকে দিন, যাতে আলো কম পড়ে। টিয়ার ভালো ঘুম দরকার
সুস্থ থাকতে। ঘুম কম হলে পাখি খিটখিটে আর দুর্বল হয়ে যায়। রোজ একটু সময় দিন
পাখির সাথে গল্প করতে। খাওয়ানো আর পরিষ্কার তো আছেই, সাথে চাই একটু আদর। এই
ভালোবাসাটুকুই পাখির মনকে চাঙা রাখে। রোজকার এই নিয়মেই আপনার টিয়া হয়ে উঠবে
প্রাণবন্ত আর সুখী।
পোষ মানানোর সাধারণ ভুল
বাসায় টিয়া পাখি পোষ মানানোর সহজ উপায় জানার পাশাপাশি কিছু সাধারণ ভুলও
এড়িয়ে চলা জরুরি। কারণ ছোট একটা ভুলেই মাসের পরিশ্রম মাটি হয়ে যায়। অনেকে না
বুঝেই এসব ভুল করে বসেন। ফলে পাখি আর বশে আসে না। সবচেয়ে বড় ভুলটা হলো
তাড়াহুড়ো করা। নতুন পাখি আনতে না আনতেই অনেকে হাতে ওঠাতে চান। কিন্তু পাখি তখনো
ভয়ে জড়সড়। এই তাড়াহুড়োই পাখির মনে আতঙ্ক গেঁথে দেয় চিরতরে। আরেকটা মারাত্মক
ভুল হলো জোর করে ধরা। পাখি কাছে না এলে অনেকে খপ করে চেপে ধরেন। এতে পাখি ভীষণ
ভয় পায়, বিশ্বাস ভেঙে চুরমার হয়। মনে রাখবেন, জোর করে ভালোবাসা আদায় হয় না
কখনো। উঁচু গলায় ধমক দেওয়াও একটা বড় ভুল।
পাখি কথা না শুনলে বা কামড় দিলে অনেকে রেগে যান। কিন্তু চিৎকার শুনলে পাখি
আপনাকে শত্রু ভাবতে শুরু করে। নরম গলাই এখানে আসল অস্ত্র। খাবারের ব্যাপারে
অবহেলাও চোখে পড়ে অনেকের। শুধু বীজ দিয়ে দিন কাটিয়ে দেন, ফল বা শাক দেন না।
এতে পাখি দুর্বল হয়ে পড়ে, মেজাজও খিটখিটে হয়। অসুস্থ পাখি কখনো ভালোভাবে পোষ
মানে না। অনেকে আবার পাখিকে একা ফেলে রাখেন দিনভর। টিয়া বড্ড মিশুক প্রাণী,
একাকীত্ব ওর সহ্য হয় না। সঙ্গ না পেলে পাখি মনমরা আর জেদি হয়ে ওঠে। রোজ একটু
সময় দেওয়া তাই বাধ্যতামূলক। ঘনঘন নিয়ম বদলানোও একটা লুকানো ভুল। আজ এক সময়ে
খাবার, কাল আরেক সময়ে। এই অনিয়মে পাখি ভরসা হারায়।
একটা বাঁধা রুটিন পাখিকে যতটা স্বস্তি দেয়, বিশৃঙ্খলা ঠিক ততটাই অস্থির করে
তোলে। শেষ কথা হলো, ধৈর্য হারানোই সবচেয়ে বড় ভুল। দু-চারদিনে ফল না পেয়ে অনেকে
হাল ছেড়ে দেন। কিন্তু পোষ মানানো ধৈর্যের খেলা। এই ভুলগুলো এড়িয়ে চললে আপনার
টিয়া অল্প দিনেই হয়ে উঠবে আপনার আপনজন।
রাগী টিয়া পাখি শান্ত করার উপায়
টিয়া পাখিও কিন্তু রাগ করে, ঠিক আমাদের মতোই। খাঁচার শিক কামড়ায়, তীক্ষ্ণ সুরে
চিৎকার করে, কাছে গেলে ঠোকর মারে। এমন রাগী পাখি দেখে ঘাবড়ে যাবেন না। একটু
বুদ্ধি খাটালেই ওকে শান্ত করা যায়। প্রথমেই বোঝার চেষ্টা করুন, পাখিটা রাগছে
কেন। ক্ষুধা, ভয়, একাকীত্ব বা অসুস্থতা, যেকোনো কিছুই কারণ হতে পারে। কারণটা
ধরতে পারলে অর্ধেক সমাধান হাতের মুঠোয়। তাই আগে পাখির আচরণটা মন দিয়ে খেয়াল
করুন। পাখি রেগে গেলে আপনি নিজে শান্ত থাকুন। এই সময় চিৎকার করলে বা ধমক দিলে
পাখি আরও ক্ষেপে যাবে। বরং নরম গলায় আস্তে আস্তে কথা বলুন। আপনার শান্ত স্বর
পাখির উত্তেজনা ধীরে ধীরে কমিয়ে দেবে।
রাগী পাখিকে জোর করে ধরতে যাবেন না একদম। এতে সে আরও ভয় পাবে, রাগ বাড়বে বই
কমবে না। বরং একটু দূরত্ব রাখুন, ওকে নিজের মতো শান্ত হতে দিন। সময় দিলে পাখি
নিজেই ঠান্ডা হয়ে আসে। খাঁচার পরিবেশটাও একবার দেখে নিন। বেশি আলো, হইচই বা অন্য
পোষা প্রাণীর উপস্থিতি পাখিকে অস্থির করে তোলে। খাঁচাটা একটু শান্ত, নিরিবিলি
জায়গায় সরিয়ে দিন। শান্ত পরিবেশে পাখির মেজাজও ঠান্ডা হয়। প্রিয় খাবার
এখানেও দারুণ কাজে দেয়। রাগী পাখির সামনে একটু পেয়ারা বা কাঁচা মরিচ ধরুন।
খাবারের লোভে পাখির মনোযোগ ঘুরে যাবে, রাগ পড়ে যাবে ধীরে ধীরে। পেট ঠান্ডা তো
মেজাজও ঠান্ডা।
মাঝেমধ্যে রাগের পেছনে লুকিয়ে থাকে অসুখ। যদি দেখেন পাখি হঠাৎ বেশি খিটখিটে,
ঝিমিয়ে আছে বা খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে, দেরি করবেন না। এমন লক্ষণে সোজা পাখির
ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। একটাই, ভালোবাসা আর ধৈর্য দিয়েই রাগ জয় করা যায়।
রোজ একটু সময় দিন, নরম আচরণ করুন। দেখবেন কিছুদিনেই সেই রাগী পাখিটা কেমন শান্ত,
নরম আর আদুরে হয়ে উঠেছে।
শেষ কথাঃ লেখকের মন্তব্য
এতক্ষণ ধরে টিয়া পাখি পোষ মানানোর নানা কৌশল নিয়ে কথা বললাম। আশা করি লেখাটা
আপনার কাজে লাগবে। তবে একটা কথা মন থেকে বলি, কোনো নিয়মই ভালোবাসার বিকল্প নয়।
মায়া দিয়েই আসল কাজটা হয়। আমি নিজে দেখেছি, ধৈর্য যার আছে, পাখি ঠিক তার হাতেই
ধরা দেয়। তাড়াহুড়ো করে কিছু হয় না। আপনি যদি রোজ একটু একটু করে সময় দেন, ফল
পাবেনই। বিশ্বাস রাখুন নিজের ওপর, আর পাখিটার ওপরও।
মনে রাখবেন, প্রতিটি পাখির স্বভাব আলাদা। কেউ চটজলদি বশে আসে, কারও একটু সময়
লাগে। তাই অন্যের পাখির সাথে নিজের পাখিকে মেলাবেন না। ওকে ওর নিজের গতিতে বেড়ে
উঠতে দিন। শেষমেশ এটুকুই বলব, পাখিটাকে শুধু পোষা প্রাণী নয়, একজন বন্ধু
ভাবুন। ওর সুখ-দুঃখের খেয়াল রাখুন। দেখবেন এই ছোট্ট প্রাণীটাই একদিন আপনার জীবনে
এনে দেবে অগাধ আনন্দ।
লেখাটা ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের সাথেও শেয়ার করুন। আর টিয়া পোষা নিয়ে কোনো
প্রশ্ন থাকলে নির্দ্বিধায় জানাবেন। ভালো থাকুন, আপনার পাখিটাও ভালো থাকুক। এই
কামনাই রইল।

.webp)


ইনফোনেস্টইনের শর্তাবলী মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট পর্যাবেক্ষন করা হয়।
comment url