দুধে এলার্জি ও ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের পার্থক্য

দুধে এলার্জি ও ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের পার্থক্য সহজ ভাষায় জানুন, যাতে ভুল ধারণা দূর হয়। দুধ খাওয়ার পর কারও পেট ফাঁপে, আবার কারও শুরু হয় চুলকানি বা শ্বাসকষ্ট-কিন্তু দুটোর কারণ এক নয়। কোন লক্ষণে সতর্ক হবেন ও কখন খাবার বদলাবেন, জানুন এখানে।
দুধে-এলার্জি-ও-ল্যাকটোজ-ইনটলারেন্সের-পার্থক্য
এক কাপ দুধ নিয়ে এত ঝামেলা কেন হয়, সেই রহস্যটা ধীরে ধীরে পরিষ্কার হবে। শিশু ও বড়দের ক্ষেত্রে লক্ষণ কীভাবে আলাদা হতে পারে, তা জানুন সহজ উদাহরণে। খাবার নিয়ে অযথা ভয় নয়-সঠিক তথ্য জেনে নিজের জন্য ঠিক সিদ্ধান্ত নিন।

পোস্ট সূচিপত্রঃ দুধে এলার্জি ও ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের পার্থক্য

দুধে এলার্জি ও ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের পার্থক্য

দুধে এলার্জি ও ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের পার্থক্য-এই বিষয়টি আসলে অনেকেই ঠিকমতো বোঝেন না। আমিও একসময় ভাবতাম, দুধ খেলে পেট ফাপলে মানেই সবার একই সমস্যা। কিন্তু ব্যাপারটা একদম তা না। দুটি সমস্যার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ আছে। পার্থক্যগুলো-চলুন, একটু সহজ ভাষায় ভেঙে বলি।

  • দুধে এলার্জি মানে শরীরের ইমিউন সিস্টেম দুধের প্রোটিনকে শত্রু ভেবে আক্রমণ করে। এর ফলে ত্বকে ফোসকা, শ্বাসকষ্ট, চোখ লাল হয়ে যেতে পারে। কখনো কখনো জীবনঝুঁকিও তৈরি হয়।
  • ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স হলো শরীরে ল্যাকটেজ এনজাইমের ঘাটতি। দুধের চিনি হজম হয় না। পেট ফোলা, ডায়রিয়া, গ্যাস হয়। তবে এটি কখনো প্রাণঘাতী নয়।
  • আরেকটা মজার পার্থক্য হলো সময়। এলার্জি সাধারণত কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রকাশ পায়। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের লক্ষণ দেখা দেয় আধঘণ্টা থেকে দুই ঘণ্টা পরে।
  • বয়সও একটা বড় বিষয়। দুধে এলার্জি বাচ্চাদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, বড় হলে কমতে পারে। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স উল্টোটা-বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে।
  • চিকিৎসার দিক থেকেও তফাৎ আছে। এলার্জিতে অ্যান্টিহিস্টামিন বা ইপিনেফ্রিন লাগতে পারে। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সে ল্যাকটেজ ট্যাবলেট বা ল্যাকটোজ-ফ্রি খাবারই যথেষ্ট।
  • দুধ এড়িয়ে চলার প্রয়োজনীয়তাও আলাদা। এলার্জি থাকলে দুধ সম্পূর্ণ বাদ দিতে হয়। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স থাকলে কম পরিমাণে দুধ বা দই, পনির মতো ফার্মেন্টেড খাবার সহ্য করতে পারেন অনেকে।
  • রক্ত পরীক্ষায়ও ভিন্নতা আসে। এলার্জি ধরা পড়ে আইজিই অ্যান্টিবডি টেস্টে। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স বোঝা যায় হাইড্রোজেন ব্রিথ টেস্ট বা ল্যাকটোজ টলারেন্স টেস্ট দিয়ে।
দুধে-এলার্জি-ও-ল্যাকটোজ-ইনটলারেন্সের-পার্থক্য
  • খাবারের তালিকায় ভুল বোঝাবুঝি হয় না। এলার্জি থাকলে দুধের প্রোটিন যেকোনো খাবারে থাকলেই বিপদ। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সে শুধু দুধের চিনিই সমস্যা, প্রোটিন নয়। তাই কিছু প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া যায়।
  • পরিবারের ইতিহাসও একটা ইঙ্গিত দেয়। দুধে এলার্জি বেশি হয় অ্যাটোপিক ডার্মাটাইটিস বা অ্যাজমার ইতিহাস থাকা পরিবারে। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স বেশি দেখা যায় এশিয়ান, আফ্রিকান বা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে।
  • জীবনযাত্রার প্রভাবও আলাদা। এলার্জি থাকলে রেস্তোরাঁয় খেতে গেলে লেবেল পড়তে হয় সতর্কতায়। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সে একটু সচেতনতাই যথেষ্ট, তবে জীবন মোটামুটি স্বাভাবিক চলে।
  • আবার কিছু মানুষ দুটোই একসাথে পান। হ্যাঁ, এমনটাও হয়। তবে সেটি বিরল। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একটির সাথেই মানুষকে লড়াই করতে হয়।
  • শিশুর ক্ষেত্রে বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয়। দুধে এলার্জি থাকলে শিশু কাঁদতে থাকে, ত্বকে র‍্যাশ ওঠে, ওজন কমতে থাকে। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সে শুধু পেটের সমস্যা হয়, বাকি সব ঠিকঠাক থাকে।
  • গর্ভবতী মায়েরা কিন্তু এ নিয়ে চিন্তিত হন। দুধে এলার্জি থাকলে ব্রেস্টফিডিং নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সে মায়ের দুধ খাওয়ানো নিয়ে তেমন সমস্যা হয় না, শুধু মায়ের খাদ্যাভ্যাসে একটু পরিবর্তন চাই।
  • প্রতিরোধের উপায়ও আলাদা। এলার্জিতে এখনো কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষেধক নেই, শুধু এড়িয়ে চলাই ভরসা। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সে ল্যাকটেজ এনজাইম সাপ্লিমেন্ট বা প্রোবায়োটিক কিছুটা সাহায্য করতে পারে।
আর শেষে একটা কথা-ডাক্তারের পরামর্শ কখনো উপেক্ষা করবেন না। নিজে নিজে ধারণা করে ওষুধ খাওয়ার চেয়ে একবার বিশেষজ্ঞের কাছে গিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিন। আপনার শরীর, আপনার দায়িত্ব। সুস্থ থাকুন, সচেতন থাকুন।

দুধে এলার্জি হলে শরীরে কী ঘটে

দুধে এলার্জি হলে শরীরে কী ঘটে-চলুন, একটু গভীরে নামি। কারণ এই জিনিসটা শুধু পেট ফোলা বা ডায়রিয়ার মতো সরল না। এখানে আসলে আপনার শরীরের নিজের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একটা ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। সে ভাবে দুধের প্রোটিন, বিশেষ করে কেসিন আর হুই, শত্রু। আর শত্রুকে তো আক্রমণ করতেই হবে, তাই না? প্রথম ধাক্কাটা লাগে সাধারণত কয়েক মিনিটের মধ্যেই। মুখের চারপাশে লালচে দাগ দেখা দেয়। চুলকানি শুরু হয় জিহ্বায়, ঠোঁটে। কেউ কেউ বলেন, মনে হয় কিছু একটা কামড় দিচ্ছে ভেতর থেকে। তারপর ত্বকে ছোট ছোট ফোসকা ওঠে। একসময় সেগুলো মিলে বড় র‍্যাশে রূপ নেয়। হাত, পা, মুখ-সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। চুলকানিতে রাতের ঘুম উড়ে যায়। 

শিশুরা তো কাঁদতেই থাকে, বুঝাতেও পারে না কী হয়েছে। শ্বাসনালীতে প্রভাব পড়লে ব্যাপারটা আরও গম্ভীর হয়। গলা ফুলে ওঠে। কথা বলতে কষ্ট হয়। শ্বাস নিতে হাপর খেতে হয়। কেউ কেউ বলেন, মনে হয় কেউ গলা টিপে ধরেছে। এই অবস্থায় দেরি করলে অ্যাফিল্যাক্সিস হতে পারে। রক্তচাপ হুহু করে নামতে থাকে। চোখের সামনে অন্ধকার নামে। হৃৎস্পন্দন দুর্বল হয়ে যায়। এমনটা হলে ইপিনেফ্রিন ইঞ্জেকশন ছাড়া উপায় থাকে না। সময় মতো চিকিৎসা না পেলে জীবনও বিপন্ন হতে পারে। তাই দুধে এলার্জিকে কখনো হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। পেটের দিকেও প্রভাব পড়ে। বমি ভাব আসে। পেটে তীব্র ব্যথা হয়। কখনো কখনো রক্তমিশ্রিত ডায়রিয়াও হয়। শিশুরা তো বেশি কষ্ট পায়। 
ওজন কমতে থাকে। বড় হওয়ার গতি থমকে যায়। মায়েরা ভাবেন, বাচ্চা হয়তো শুধু দুধ খেতে চায় না। কিন্তু আসলে শরীর ভেতরে যুদ্ধ করছে। প্রতিবার দুধ খাওয়ার পর শরীর একটা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। ইমিউন সেলগুলো হিস্টামিন ছাড়তে থাকে। রক্তনালী ফুলে ওঠে। শরীরের বিভিন্ন অংশে প্রদাহ তৈরি হয়। এই প্রক্রিয়াটা বারবার হলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। চোখেও প্রভাব পড়ে। চোখ লাল হয়ে যায়। জল পড়তে থাকে। চুলকায় অসহ্যভাবে। কেউ কেউ বলেন, মনে হয় ধুলোয় অ্যালার্জি হয়েছে। কিন্তু আসলে দুধের প্রোটিনই দোষী। নাকও বন্ধ হয়ে আসে। হাঁচি আসতে থাকে। মনে হয় সর্দি লেগেছে। অনেকেই তাই ভুল বোঝেন। ভাবেন হয়তো আবহাওয়ার দোষ। কিন্তু খাবারের তালিকায় একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়, দুধই মূল খলনায়ক।

বড়দের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। তবে প্রতিক্রিয়া একটু ভিন্ন হতে পারে। কেউ কেউ মাইগ্রেনের মতো মাথাব্যথা পান। কারো কারো জয়েন্টে ব্যথা হয়। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। ঘুম ভেঙে যায়। সারাদিন ক্লান্তি ঘোরে। এই সব লক্ষণ মিলিয়ে একটা ছবি তৈরি হয়। আর সেই ছবিটা কখনো সুন্দর হয় না। দীর্ঘমেয়াদে দুধে এলার্জির প্রভাব আরও গভীর হয়। শিশুরা যদি বারবার দুধ খেয়ে এলার্জির শিকার হয়, তাহলে তাদের খাদ্যনালীতে প্রদাহ তৈরি হতে পারে। ইওজিনোফিলিক এসোফেজাইটিস নামে একটা রোগ হয়। খাবার গলায় আটকায়। খেতে ভয় পায় বাচ্চারা। বড় হলে খাদ্যাভ্যাসে বিকৃতি তৈরি হতে পারে। তাই শিশুকাল থেকেই সচেতনতা চাই। মায়েরা যদি ব্রেস্টফিডিং করেন, তাহলে নিজের খাদ্যাভ্যাসেও সতর্ক থাকতে হবে। মায়ের দুধের মাধ্যমেও দুধের প্রোটিন শিশুর শরীরে যেতে পারে।

আরেকটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে। দুধে এলার্জি একবার হলে সারাজীবন থাকতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বড় হলে কমে, কিন্তু সবার ক্ষেত্রে তা হয় না। তাই এড়িয়ে চলাই সবচেয়ে ভালো উপায়। দুধের বিকল্প আজকাল প্রচুর পাওয়া যায়। সয়া দুধ, বাদামের দুধ, ওটসের দুধ-বাজার ভর্তি। রেস্তোরাঁয় খেতে গেলে লেবেল পড়ুন। কেক, বিস্কুট, চকলেটেও দুধ লুকিয়ে থাকে। একটু সতর্কতাই আপনাকে নিরাপদ রাখবে। আর যদি কখনো গুরুতর প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, দেরি না করে হাসপাতালে ছুটুন। আপনার জীবনের মূল্য কোনো দুধের চেয়ে অনেক বেশি।

ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স কেন হয়

ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স কেন হয়-এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে। আমাদের শরীরে একটা এনজাইম কাজ করে, নাম ল্যাকটেজ। এর কাজ হলো দুধের চিনি, অর্থাৎ ল্যাকটোজ,কে ভেঙে ছোট ছোট অংশে ভাগ করা। ছোট হলে শরীর সহজে হজম করতে পারে। কিন্তু যখন ল্যাকটেজ কমে যায়, তখনই সমস্যা শুরু হয়। দুধের চিনি হজম হয় না। সেটা পাকস্থলীতে বসে থাকে। ব্যাকটেরিয়া সেটাকে খেতে শুরু করে। আর তখনই গ্যাস তৈরি হয়। পেট ফোলে। ব্যথা শুরু হয়। ডায়রিয়া হয়। মোট কথা, একটা ছোট এনজাইমের ঘাটতি আপনার পুরো দিনটাই নষ্ট করে দিতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো, এই এনজাইম কমে যায় কেন? একটা বড় কারণ হলো বয়স। 

আমরা যখন শিশু, তখন মায়ের দুধ খাই। তখন ল্যাকটেজ প্রচুর পরিমাণে তৈরি হয়। কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটা কমতে থাকে। প্রকৃতিতে এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। মানুষের শরীর বুঝতে পারে, এখন আর মায়ের দুধ লাগবে না। তাই ল্যাকটেজ তৈরি কমিয়ে দেয়। কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা তো দুধ ছাড়তে পারি না। চা, কফি, মিষ্টি, দই-সবখানেই দুধ। তাই যখন বড় হয়েও দুধ খাই, তখন শরীর হিমশিম খায়। আরেকটা বিষয় হলো জিন। হ্যাঁ, আপনার বংশধরাও এখানে দায়ী থাকতে পারে। দুধে এলার্জি ও ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের পার্থক্য বোঝার সময় এই জিনগত বিষয়টা মাথায় রাখতে হবে। ইউরোপীয়দের মধ্যে ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স কম দেখা যায়। 

কারণ তাদের পূর্বপুরুষরা হাজার বছর ধরে গবাদি পশু পালন করেছে। তাদের শরীর ল্যাকটেজ তৈরি করতে শিখেছে। কিন্তু এশিয়ান, আফ্রিকান বা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই সমস্যা প্রচুর। বাংলাদেশ, ভারত, চীন-এসব দেশের মানুষের মধ্যে ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের হার ৬০-৯০ শতাংশ। মানে আপনার পাশের বাড়ির চাচা, আপনার বন্ধু, হয়তো আপনিও-সবাই এই সমস্যায় ভুগতে পারেন। কিছু রোগের কারণেও ল্যাকটেজ কমে যায়। ক্রোহনস ডিজিজ, সেলিয়াক ডিজিজ, ইনফ্লেমেটরি বাউয়েল ডিজিজ-এসব রোগে অন্ত্রের ভেতরের আস্তরণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেখানেই তো ল্যাকটেজ তৈরি হয়। আস্তরণ নষ্ট হলে এনজাইম তৈরিও বন্ধ হয়ে যায়।
দুধে-এলার্জি-ও-ল্যাকটোজ-ইনটলারেন্সের-পার্থক্য
আবার কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায়ও ল্যাকটোজ হজম কমতে পারে। অ্যান্টিবায়োটিক দীর্ঘদিন খেলে অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়া মরে যায়। তখন হজমে সমস্যা হয়। কেমোথেরাপি, রেডিয়েশন থেরাপি-এসবেও অন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে আরেকটা কারণ আছে। প্রিম্যাচিউর বাচ্চাদের অন্ত্র পরিপক্ব হয় না। তাই ল্যাকটেজ কম তৈরি হয়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বড় হলে এই সমস্যা কমে যায়। কিন্তু কিছু শিশুর ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি হয়। তখন ডাক্তাররা বিশেষ ফর্মুলা দুধ পরামর্শ দেন। ল্যাকটোজ-ফ্রি দুধ বা হাইড্রোলাইজড দুধ-এসবই বিকল্প। আরেকটা মজার কথা বলি। কেউ কেউ ভাবেন, দুধ ঠান্ডা খেলে ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স হয়। এটা একদম ভুল ধারণা। 

ঠান্ডা বা গরম-তাপমাত্রার সঙ্গে ল্যাকটোজের কোনো সম্পর্ক নেই। সমস্যা হলো শরীরে এনজাইমের ঘাটতি। তবে হ্যাঁ, ঠান্ডা দুধে কিছু মানুষের পেট বেশি ফোলে। সেটা অন্য কারণে, ল্যাকটোজের জন্য নয়। আরেকটা বিষয় মাথায় রাখুন। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স মানে এই না যে আপনি সব ধরনের দুধই খেতে পারবেন না। কিছু কিছু দুধে ল্যাকটোজ কম থাকে। যেমন দই, পনির, ছানা-এসব ফার্মেন্টেড খাবারে ল্যাকটোজ ভেঙে যায়। তাই অনেকে এগুলো সহজে হজম করতে পারেন। 

আবার কেউ কেউ ল্যাকটেজ ট্যাবলেট খেয়ে দুধ খান। এতে এনজাইমের কাজটা বাইরে থেকে হয়ে যায়। তবে সবার ক্ষেত্রে একই নিয়ম কাজ করে না। আপনার শরীর কী বলে, সেটাই শুনুন। একবার দুধ খেয়ে দেখুন। পেট ফুললে, গ্যাস হলে-বুঝবেন আপনার শরীর কী চায়। শরীরের কথা শোনা সবচেয়ে বড় বুদ্ধিমানের কাজ।

দুধ খাওয়ার পর কোন কোন লক্ষণ দেখা দিতে পারে

দুধ খাওয়ার পর কোন কোন লক্ষণ দেখা দিতে পারে-চলুন, একটু সহজ ভাষায় ভেঙে বলি। কারণ অনেকেই জানেন না, পেট ফোলাটা আসলে কোন সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। কেউ কেউ ভাবেন, হয়তো সকালের চা ভারি হয়ে গেছে। কিন্তু ব্যাপারটা অনেক গভীর হতে পারে। প্রথমেই আসে পেটের সমস্যা। দুধ খাওয়ার আধঘণ্টা পর থেকে পেট ফুলতে শুরু করে। মনে হয় কেউ ভেতরে বেলুন ফুলিয়ে দিয়েছে। গ্যাস বেরোতে চায় কিন্তু বেরোয় না। পেটে তীব্র ব্যথা হয়। কখনো কখনো পেট কামড়ানোর মতো ব্যথা ওঠে। ডায়রিয়া শুরু হয়। বারবার টয়লেটে যেতে হয়। কেউ কেউ বলেন, মনে হয় পেটের ভেতর একটা যুদ্ধ চলছে। এই যুদ্ধটা আসলে ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের ক্ষেত্রে বেশি হয়। 

কিন্তু দুধে এলার্জিতেও পেটের সমস্যা দেখা দেয়। তবে সেখানে বমি বমি ভাবটা বেশি থাকে। রক্তমিশ্রিত ডায়রিয়াও হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে এই লক্ষণগুলো আরও স্পষ্ট হয়। ত্বকে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় দ্রুত। মুখের চারপাশে লালচে দাগ ওঠে। চুলকানি শুরু হয়। ছোট ছোট ফোসকা ওঠে। একসময় সেগুলো মিলে বড় র‍্যাশে পরিণত হয়। হাতে, পায়ে, পিঠে-সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। চুলকানিতে ঘুম উড়ে যায়। শিশুরা নিজেদের আঁচড় কাটতে থাকে। ত্বক শুষ্ক হয়ে যায়। কেউ কেউ একজিমার মতো সমস্যায় ভোগেন। এই লক্ষণগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দুধে এলার্জির ইঙ্গিত দেয়। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সে ত্বকের সমস্যা কম হয়। শ্বাসকষ্ট একটা গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। 

গলা ফুলে ওঠে। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। কাশি আসতে থাকে। কেউ কেউ বলেন, মনে হয় কেউ গলা টিপে ধরেছে। এই অবস্থায় দেরি করলে অ্যাফিল্যাক্সিস হতে পারে। চোখের সামনে অন্ধকার নামে। রক্তচাপ নামতে থাকে। হৃৎস্পন্দন দুর্বল হয়। এমনটা হলে এক মিনিটও দেরি করা যাবে না। ইপিনেফ্রিন ইঞ্জেকশন দিতে হবে। হাসপাতালে ছুটতে হবে। দুধে এলার্জিতে এই লক্ষণগুলো বেশি দেখা যায়। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সে শ্বাসকষ্ট কম হয়। চোখেও প্রভাব পড়ে। চোখ লাল হয়ে যায়। জল পড়তে থাকে। চুলকায় অসহ্যভাবে। কেউ কেউ ভাবেন ধুলোয় অ্যালার্জি হয়েছে। কিন্তু আসলে দুধের প্রোটিনই দোষী। নাক বন্ধ হয়ে আসে। হাঁচি আসতে থাকে। মনে হয় সর্দি লেগেছে। 

অনেকেই তাই ভুল বোঝেন। কিন্তু খাবারের তালিকায় একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়, দুধই মূল খলনায়ক। মাথাব্যথাও একটা সাধারণ লক্ষণ। বিশেষ করে বড়দের ক্ষেত্রে। মাইগ্রেনের মতো ব্যথা হয়। মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। ঘুম ভেঙে যায়। সারাদিন ক্লান্তি ঘোরে। কেউ কেউ বলেন, মনে হয় রক্তচাপ বেড়ে গেছে। কিন্তু আসলে দুধের প্রোটিন বা চিনি শরীরে প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে। এই লক্ষণগুলো দুটি ক্ষেত্রেই হতে পারে। তবে দুধে এলার্জিতে মাথাব্যথার সঙ্গে ত্বকের সমস্যা বেশি থাকে। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সে পেটের সমস্যাটাই বেশি প্রাধান্য পায়। শিশুদের ক্ষেত্রে আরেকটা লক্ষণ দেখা যায়। দুধ খাওয়ার পর কাঁদতে থাকে। শান্ত হয় না। পেটে হাত দিলে শক্ত মনে হয়। ওজন কমতে থাকে। 

বড় হওয়ার গতি থমকে যায়। মায়েরা ভাবেন বাচ্চা হয়তো শুধু দুধ খেতে চায় না। কিন্তু আসলে শরীর ভেতরে যুদ্ধ করছে। প্রতিবার দুধ খাওয়ার পর শরীর একটা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। এই লক্ষণগুলো দেখলে দেরি না করে ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত। আরেকটা বিষয় মাথায় রাখুন। লক্ষণগুলোর তীব্রতা মানুষে মানুষে ভিন্ন হয়। কেউ এক গ্লাস দুধ খেয়েও ঠিকঠাক থাকেন। কেউ এক চামচ দুধে পুরো দিন নষ্ট হয়ে যায়। শরীরের ভাষা শোনাটাই বড় কথা। আপনার শরীর কী বলছে, সেটা বুঝুন। একটু খেয়াল করলেই বোঝা যাবে, দুধ আপনার বন্ধু না শত্রু।

দুধে এলার্জি আর ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স কীভাবে বুঝবেন

দুধে এলার্জি আর ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স কীভাবে বুঝবেন-এই প্রশ্নটা মাথায় ঘুরপাক খায় অনেকের। আমিও একসময় ভাবতাম, পেট ফুললেই তো একই কথা। কিন্তু বাস্তবে দুটো সমস্যার মধ্যে পার্থক্য বোঝা জরুরি। নাহলে চিকিৎসাও ভুল হতে পারে। আর ভুল চিকিৎসা মানে দিনের পর দিন কষ্ট। চলুন, কিছু সহজ উপায় বলি। প্রথমেই লক্ষণের সময়টা দেখুন। দুধ খাওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই যদি মুখ ফুলে ওঠে, চোখ লাল হয়, শ্বাসকষ্ট শুরু হয়-তাহলে বুঝবেন এটা এলার্জি। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সে সময় লাগে। আধঘণ্টা থেকে দুই ঘণ্টা পরে পেট ফোলা, গ্যাস, ডায়রিয়া শুরু হয়। সময়টা মাথায় রাখলেই অনেকটা স্পষ্ট হয়ে যায়।

ত্বকের অবস্থা দেখুন। দুধে এলার্জিতে ত্বকে র‍্যাশ ওঠে। চুলকানি হয়। ফোসকা পড়ে। শিশুদের ক্ষেত্রে একজিমার মতো দাগ দেখা দেয়। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সে ত্বকের সমস্যা কম হয়। মূলত পেটের দিকেই প্রভাব পড়ে। তাই ত্বকে কিছু দেখা গেলে বুঝবেন এলার্জির দিকে ঝুঁকি বেশি। শ্বাসকষ্ট একটা বড় ইঙ্গিত। দুধে এলার্জিতে গলা ফুলে যেতে পারে। শ্বাস নিতে হাপর খেতে হয়। কাশি আসে। এই লক্ষণ দেখা দিলে এক মিনিটও দেরি করা যাবে না। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সে শ্বাসকষ্ট হয় না। পেট ফোলা, ব্যথা, ডায়রিয়াই মূল সমস্যা। দুধে এলার্জি ও ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের পার্থক্য বোঝার ক্ষেত্রে এই শ্বাসকষ্টের বিষয়টা একটা বড় চাবিকাঠি। শ্বাসকষ্ট মানে এলার্জি, পেটের সমস্যা মানে ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স-এটা একটা সাধারণ নিয়ম।

খাবারের তালিকা একটু খেয়াল করুন। কেবল দুধ খেলেই যদি সমস্যা হয়, তাহলে ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু দুধ ছাড়াও দই, পনির, ছানা, কেক, বিস্কুট-এসব খেলেও যদি একই লক্ষণ দেখা দেয়, তাহলে এলার্জির কথা ভাবুন। কারণ এলার্জিতে দুধের প্রোটিনই শত্রু। আর প্রোটিন সব ধরনের দুধজাত খাবারেই থাকে। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সে কিছু ফার্মেন্টেড খাবার সহ্য হতে পারে। কারণ সেগুলোতে ল্যাকটোজ কম থাকে। বয়সটাও একটা ইঙ্গিত দেয়। শিশুদের মধ্যে দুধে এলার্জি বেশি দেখা যায়। বড় হলে কমতে পারে। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স উল্টোটা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে। তাই যদি আপনার বাচ্চা ছোটবেলায় দুধে সমস্যা করে, তাহলে এলার্জির দিকে ঝুঁকুন।
আর যদি ত্রিশ-চল্লিশ বছর বয়সে হঠাৎ দুধে পেট ফোলা শুরু হয়, তাহলে ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের কথা ভাবুন। পরিবারের ইতিহাস দেখুন। আপনার বাবা-মা বা ভাই-বোনের যদি দুধে এলার্জি থাকে, তাহলে আপনারও হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এটা জিনগত বিষয়। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সও পরিবারে ছড়িয়ে থাকতে পারে। তবে এলার্জির জিনগত সম্পর্কটা একটু শক্ত। আপনার পরিবারে অ্যাজমা, অ্যাটোপিক ডার্মাটাইটিস, হেফিভারের ইতিহাস থাকলে দুধে এলার্জির ঝুঁকি বাড়ে। একটা ছোট পরীক্ষা করতে পারেন। কয়েকদিন দুধ সম্পূর্ণ বাদ দিন। দেখুন লক্ষণ কমে কিনা। তারপর আবার দুধ খান। যদি একই সমস্যা ফিরে আসে, তাহলে বুঝবেন দুধই দোষী। 

কিন্তু এই পরীক্ষাটা এলার্জির ক্ষেত্রে সতর্কতায় করুন। কারণ দুধে এলার্জি থাকলে পুনরায় খাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। তীব্র প্রতিক্রিয়া হতে পারে। তাই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া এই পরীক্ষাটা করবেন না। রক্ত পরীক্ষা একদম নিশ্চিত করে দেয়। দুধে এলার্জি ধরা পড়ে আইজিই অ্যান্টিবডি টেস্টে। ত্বকের প্রিক টেস্টও করা যায়। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স বোঝা যায় হাইড্রোজেন ব্রিথ টেস্ট দিয়ে। ল্যাকটোজ টলারেন্স টেস্টও আছে। এই পরীক্ষাগুলো করালেই আর কোনো সন্দেহ থাকে না। 

ডাক্তার ঠিক বলে দেবেন আপনার সমস্যাটা কী। শেষে একটা কথা। নিজে নিজে ধারণা করে ওষুধ খাওয়ার চেয়ে একবার বিশেষজ্ঞের কাছে গিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিন। আপনার শরীর, আপনার দায়িত্ব। ভুল সিদ্ধান্ত একদিন নয়, সারাজীবনের কষ্ট এনে দিতে পারে। তাই একটু সময় নিন। খেয়াল করুন। পরীক্ষা করান। তারপর সঠিক পথে হাঁটুন।

শিশু ও বড়দের ক্ষেত্রে সমস্যার পার্থক্য

শিশু ও বড়দের ক্ষেত্রে সমস্যার পার্থক্য-এই বিষয়টা একটু ভেবে দেখুন। বাচ্চা আর বড় মানুষের শরীর এক নয়। তাদের প্রতিক্রিয়াও এক রকম হয় না। একই দুধ, একই সমস্যা, কিন্তু লক্ষণ আর প্রভাব একদম আলাদা। শিশুদের ক্ষেত্রে দুধে এলার্জি বেশি দেখা যায়। তাদের ইমিউন সিস্টেম এখনো পরিপক্ব হয় নি। শরীর দুধের প্রোটিনকে সহজেই শত্রু ভেবে নেয়। বাচ্চা দুধ খাওয়ার পর কাঁদতে থাকে। শান্ত হয় না। মুখের চারপাশে লালচে দাগ ওঠে। ত্বকে ফোসকা পড়ে। একজিমার মতো সমস্যা হয়। পেট ফোলে। ব্যথায় কুঁকড়ে যায়। বমি হয়। রক্তমিশ্রিত ডায়রিয়াও হতে পারে। ওজন কমতে থাকে। বড় হওয়ার গতি থমকে যায়। মায়েরা ভাবেন বাচ্চা হয়তো শুধু দুধ খেতে চায় না। 

কিন্তু আসলে শরীর ভেতরে যুদ্ধ করছে। শিশুরা তো বুঝাতেও পারে না কী হয়েছে। তাই তাদের ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো বেশি তীব্র আর বিপজ্জনক হয়। বড়দের ক্ষেত্রে ছবিটা একটু ভিন্ন। দুধে এলার্জি কম দেখা যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শৈশবে এলার্জি থাকলে বড় হলে কমে যায়। তবে যাদের থাকে, তাদের প্রতিক্রিয়াও শিশুদের মতো তীব্র নয়। ত্বকে র‍াশ ওঠে। চুলকানি হয়। কিন্তু শ্বাসকষ্ট বা জীবনঝুঁকি কম হয়। বড়রা তো নিজেরাই বুঝতে পারেন কী হয়েছে। দ্রুত চিকিৎসা নিতে পারেন। তাই ঝুঁকিটা একটু কম। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের ক্ষেত্রেও পার্থক্য আছে। শিশুদের মধ্যে ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স বিরল। কারণ তাদের শরীরে ল্যাকটেজ এনজাইম প্রচুর থাকে।
দুধে-এলার্জি-ও-ল্যাকটোজ-ইনটলারেন্সের-পার্থক্য
মায়ের দুধ হজম করতেই তো এই এনজাইম লাগে। তবে প্রিম্যাচিউর বাচ্চাদের ক্ষেত্রে অন্ত্র পরিপক্ব হয় না। তাই ল্যাকটেজ কম তৈরি হয়। কিন্তু বেশিরভাগ শিশুই দুধ সহজে হজম করে। সমস্যা হয় বড় হওয়ার পর। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ল্যাকটেজ কমতে থাকে। ত্রিশ-চল্লিশ বছর বয়সে হঠাৎ দুধ খেয়ে পেট ফোলা শুরু হয়। গ্যাস হয়। ডায়রিয়া হয়। বড়রা ভাবেন হয়তো সকালের চা ভারি হয়ে গেছে। কিন্তু আসলে শরীরে এনজাইমের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। শিশুদের ক্ষেত্রে আরেকটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে। দুধে এলার্জি থাকলে ব্রেস্টফিডিং নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। মায়ের দুধের মাধ্যমেও দুধের প্রোটিন শিশুর শরীরে যেতে পারে। তখন শিশু কাঁদতে থাকে। মায়েরা ভাবেন নিজের দুধেই সমস্যা। 

কিন্তু আসলে মায়ের খাদ্যাভ্যাসেই দোষ। মাকে দুধ এড়িয়ে চলতে হয়। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সে এমন জটিলতা কম হয়। মায়ের দুধে ল্যাকটোজ থাকলেও শিশু সহজে হজম করে। তবে কিছু ক্ষেত্রে মাকে ল্যাকটোজ কম খেতে পরামর্শ দেওয়া হয়। খাদ্যাভ্যাসেও পার্থক্য আসে। শিশুরা তো শুধু দুধ আর দুধজাত খাবারই খায়। তাই তাদের ক্ষেত্রে দুধ বাদ দিলে পুষ্টির ঘাটতি হতে পারে। ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি, প্রোটিন-এসব কমে যায়। ডাক্তাররা বিশেষ ফর্মুলা দুধ পরামর্শ দেন। হাইড্রোলাইজড দুধ বা অ্যামিনো অ্যাসিড ভিত্তিক দুধ-এসবই বিকল্প। বড়রা তো বিভিন্ন খাবার খেতে পারেন। দুধ বাদ দিলেও অন্য উপায়ে পুষ্টি নিতে পারেন। 

সয়া দুধ, বাদামের দুধ, সবুজ শাকসবজি-এসবই ক্যালসিয়ামের ভালো উৎস। চিকিৎসার দিক থেকেও পার্থক্য আছে। শিশুদের ক্ষেত্রে ডাক্তাররা বেশি সতর্ক থাকেন। ছোট শরীর, ছোট ডোজ। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও বেশি হয়। তাই শিশুকাল থেকেই সচেতনতা চাই। বড়দের ক্ষেত্রে চিকিৎসা একটু সহজ। তবে যাদের দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা, তাদের ক্ষেত্রে অন্ত্রের ক্ষতি হতে পারে। তাই দেরি না করে চিকিৎসা নেওয়া উচিত।

দুধ না খেলে কি ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হবে

দুধ না খেলে কি ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হবে-এই প্রশ্নটা অনেকের মনে ঘুরপাক খায়। আমিও একসময় ভাবতাম, দুধ ছাড়া তো ক্যালসিয়াম পাওয়ার কোনো উপায় নেই। কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটা একদম তা না। পৃথিবীতে দুধ ছাড়াও ক্যালসিয়ামের ভাণ্ডার পুরো। শুধু একটু খেয়াল করতে হবে কোথায় কী পাওয়া যায়। প্রথমেই বলি, ক্যালসিয়াম শুধু দুধেই নেই। সরিষা শাক, পালং শাক, মেথি শাক-এসব সবুজ শাকসবজিতে ক্যালসিয়াম প্রচুর পরিমাণে থাকে। এক কাপ পালং শাকে দুধের সমান ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়। আমরা তো শাক খাইই। ভাতের সঙ্গে ভর্তা, ডালে শাক দেওয়া-এসবেই ক্যালসিয়াম লুকিয়ে আছে। তবে হ্যাঁ, শাক ভালো করে ধুয়ে রান্না করতে হবে। 

নাহলে অক্সালিক অ্যাসিড ক্যালসিয়াম শোষণে বাধা দেয়। একটু লেবুর রস দিলে শোষণ বাড়ে। ছোট ছোট টিপস, কিন্তু কাজের। ছোলা, মটরশুটি, রাজমা-এসব শুষ্ক বীজেও ক্যালসিয়াম ভরপুর। এক কাপ ছোলায় প্রায় ৮০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম থাকে। আমরা তো ছোলা ভাজা খাই, ছোলার ডাল খাই। এগুলোতে ক্যালসিয়ামের পাশাপাশি প্রোটিনও পাওয়া যায়। দুধ ছাড়া শরীর তো শুকিয়ে যাবে না। বরং ভিন্ন ভিন্ন খাবারে ভিন্ন ভিন্ন পুষ্টি পাওয়া যায়। তাই একটু বৈচিত্র্য আনুন খাদ্যাভ্যাসে। বাদাম আর বীজের কথা বলি। বাদাম, কাজু, কাঠবাদাম, তিল-এসবে ক্যালসিয়ামের পরিমাণ চোখ কপালে তুলে দেবে। এক আউন্স বাদামে প্রায় ৭৫ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম। 

সকালে দুই-চারটে বাদাম খেলেই দিনের একটা অংশ পূরণ হয়ে যায়। তিলের লাড্ডু তো আমাদের ঐতিহ্যবাহী খাবার। শীতকালে মায়েরা বানান। সেই লাড্ডুতে ক্যালসিয়ামের ভাণ্ডার। দুধে এলার্জি ও ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের পার্থক্য বোঝার পর এই বিকল্প খাবারগুলোর কথা মাথায় রাখুন। কারণ দুধ ছাড়লেও পুষ্টি ছাড়া চলবে না। মাছের কথা বলতে হবে। সার্ডিন, স্যালমন-এসব ছোট মাছের হাড়েও ক্যালসিয়াম থাকে। আমরা তো ছোট মাছ ভেজে খাই। কাঁচা মরিচ দিয়ে ভর্তা করি। সেই হাড়গুলোতেই ক্যালসিয়াম। তবে হাড় ভালো করে ভেজে নরম করতে হবে। নাহলে হজম হয় না। একটু খেয়াল করলেই শরীর উপকৃত হয়।

সয়া দুধ, বাদামের দুধ, ওটসের দুধ-এসব দুধের বিকল্প আজকাল বাজারে প্রচুর পাওয়া যায়। এগুলোতে ক্যালসিয়াম ফর্টিফাইড করা থাকে। মানে বাড়তি করে ক্যালসিয়াম মেশানো থাকে। এক গ্লাস সয়া দুধে দুধের সমান ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়। তবে লেবেল পড়ে নিন। কতটুকু ক্যালসিয়াম আছে, সেটা দেখে কিনুন। সব ব্র্যান্ড এক রকম হয় না। একটু চোখ কান খোলা রাখুন। ভিটামিন ডি-র কথাও মাথায় রাখতে হবে। ক্যালসিয়াম শুধু খেলেই হবে না, শরীরে শোষণও করতে হবে। আর ভিটামিন ডি ছাড়া ক্যালসিয়াম শোষণ হয় না। সকালের রোদে একটু হাঁটুন। ডিমের কুসুম, মাছের তেল-এসবেও ভিটামিন ডি থাকে। তাই ক্যালসিয়াম আর ভিটামিন ডি একসাথে নিন। 

দুটি মিলে কাজ করে। একটা ছাড়া আরেকটা অসম্পূর্ণ। শিশুদের ক্ষেত্রে একটু বেশি খেয়াল করতে হয়। তারা তো শুধু দুধ আর দুধজাত খাবারই বেশি খায়। দুধ বাদ দিলে পুষ্টির ঘাটতি হতে পারে। তাই ডাক্তাররা বিশেষ ফর্মুলা দুধ পরামর্শ দেন। হাইড্রোলাইজড দুধ, অ্যামিনো অ্যাসিড ভিত্তিক দুধ-এসব শিশুর পুষ্টির চাহিদা মেটায়। বড়দের ক্ষেত্রে তো অনেক বিকল্প আছে। শুধু একটু সচেতন হতে হবে। আরেকটা কথা। ক্যালসিয়ামের প্রয়োজনীয়তা মানুষে মানুষে ভিন্ন। একজন প্রাপ্তবয়স্কের দিনে ১০০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম লাগে। মহিলাদের মেনোপজের পর ১২০০ মিলিগ্রাম। গর্ভবতী মায়েদেরও একই পরিমাণ। শিশুদের কম লাগে। তবে বাড়ন্ত বয়সে বেশি লাগে। 

তাই নিজের বয়স আর শরীরের চাহিদা অনুযায়ী খাবার বাছুন। এক রকম নিয়ম সবার জন্য নয়। শেষে একটা কথা বলি। দুধ ছাড়লেই ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হবে-এই ভয়টা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। পৃথিবীতে এতো খাবার আছে, এতো বৈচিত্র্য। শুধু একটু জানতে হবে, একটু খেয়াল করতে হবে। আর যদি সত্যিই ঘাটতি মনে হয়, তাহলে ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট আছে। তবে সেটা ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া খাবেন না। বেশি ক্যালসিয়ামও শরীরের জন্য ক্ষতিকর। কিডনিতে পাথর হতে পারে। তাই সবকিছুতেই মাপ জিনিসটা মাথায় রাখুন। মাপ মতো খান, মাপ মতো চলুন। সুস্থ থাকুন।

ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সে কোন খাবারগুলো এড়িয়ে চলবেন

ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সে কোন খাবারগুলো এড়িয়ে চলবেন-এই তালিকাটা একটু জেনে রাখুন। কারণ ল্যাকটোজ লুকিয়ে থাকে এমন অনেক খাবারে যা চোখে পড়ে না। দুধে এলার্জি ও ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সের পার্থক্য বোঝার পর এই তালিকাটা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ দুধে এলার্জিতে শুধু দুধের প্রোটিনই শত্রু, কিন্তু ল্যাকটোজ ইনটলারেন্সে দুধের চিনিটাই সমস্যা। তাই কোন খাবারে কতটুকু ল্যাকটোজ আছে, সেটা জানা জরুরি।

প্রথমেই আসে সরাসরি দুধ। গরুর দুধ, ছাগলের দুধ, ভেড়ার দুধ-সব ধরনের দুধেই ল্যাকটোজ থাকে। এক গ্লাস গরুর দুধে প্রায় ১২ গ্রাম ল্যাকটোজ থাকে। তাই দুধ সম্পূর্ণ বাদ দিতে হবে। তবে ল্যাকটোজ-ফ্রি দুধ বাজারে পাওয়া যায়। সেগুলোতে ল্যাকটোজ ভেঙে ফেলা হয়। আপনার শরীরে আর হজম করতে হয় না। তবে স্বাদ একটু মিষ্টি হয়। কারণ ল্যাকটোজ ভাঙার পর গ্লুকোজ আর গ্যালাক্টোজ তৈরি হয়, যা মিষ্টি স্বাদের। কিছু মানুষের ভালো লাগে, কিছু মানুষের অভ্যস্ত হতে সময় লাগে। দই আর পনিরের কথা বলি। ফার্মেন্টেড খাবারে ল্যাকটোজ কম থাকে। ব্যাকটেরিয়া ল্যাকটোজ ভেঙে ফেলে। তবে সব দই আর পনিরে একই পরিমাণ ল্যাকটোজ থাকে না। গ্রিক দইতে ল্যাকটোজ কম। 

চিজ কেকের মতো নরম পনিরে ল্যাকটোজ বেশি। চেডার, পারমেজান-এসব শক্ত পনিরে ল্যাকটোজ কম। তাই একটু খেয়াল করে খান। প্রথমে সামান্য পরিমাণে খেয়ে দেখুন। পেট ফুললে বুঝবেন এটা আপনার জন্য নয়। শরীরের কথা শুনুন, সে সবচেয়ে ভালো জানে। আইসক্রিম আর দুধজাত মিষ্টির কথা বলতে হবে। আইসক্রিমে দুধ প্রচুর। তাই ল্যাকটোজও প্রচুর। তবে ল্যাকটোজ-ফ্রি আইসক্রিম এখন পাওয়া যায়। সয়া দুধ বা বাদামের দুধ দিয়ে তৈরি। স্বাদও মোটামুটি ভালো। কাস্টার্ড, পুডিং, কুলফি-এসবেও ল্যাকটোজ থাকে। তাই মিষ্টির দোকানে গেলে একটু সতর্ক থাকুন। নিজে বানালে বিকল্প দুধ ব্যবহার করুন। চকলেটেও দুধ থাকে। মিল্ক চকলেটে ল্যাকটোজ বেশি। ডার্ক চকলেটে কম। 

তবে লেবেল পড়ে নিন। কিছু ডার্ক চকলেটেও দুধের পাউডার মেশানো থাকে। বেকারি জিনিসপত্র একটা বড় ফাঁদ। কেক, বিস্কুট, পেস্ট্রি, ব্রেড-এসবে দুধের পাউডার, দুধের তৈলাক্ত পদার্থ মেশানো থাকে। তাই ল্যাকটোজও লুকিয়ে থাকে। একটা ক্রোস্যান্ট খেতে পারেন, আর পেট ফুলতে শুরু করতে পারে। কারণ ভেতরে মাখন বা দুধ আছে। তাই বেকারির জিনিস কিনলে লেবেল পড়ুন। "দুধজাত পদার্থ" বা "মিল্ক সলিডস" লেখা থাকলে বুঝবেন ল্যাকটোজ আছে। তবে সব জায়গায় লেবেল থাকে না। বিশেষ করে আমাদের দেশের দোকানগুলোতে। তাই একটু সতর্ক হোন। প্রসেসড মাংস আর সসেজের কথা বলি। হ্যাঁ, এসবেও দুধ থাকতে পারে। মাংস নরম করতে, স্বাদ বাড়াতে দুধের পাউডার মেশানো হয়।
কিছু কিছু সসেজে ল্যাকটোজ থাকে। তাই কিনলে লেবেল দেখুন। তবে আমাদের দেশের বাজারে তৈরি সসেজে এমনটা কম হয়। তবে আমদানি করা পণ্যে খেয়াল রাখুন। স্যুপ আর সসেও ল্যাকটোজ লুকিয়ে থাকে। ক্রিমি স্যুপে দুধ বা ক্রিম ব্যবহার করা হয়। তাই ল্যাকটোজ থাকে। টমেটো সসে কখনো কখনো দুধের পাউডার মেশানো হয়। তাই রেস্তোরাঁয় খেতে গেলে জিজ্ঞেস করুন। দুধ দিয়ে তৈরি কিনা। একটু লজ্জা পাবেন না। আপনার শরীরের কথা বলছেন, এটা আপনার অধিকার। মেডিসিন আর ভিটামিন সাপ্লিমেন্টের কথা বলতে হবে। হ্যাঁ, ওষুধেও ল্যাকটোজ থাকতে পারে। ট্যাবলেট তৈরিতে বাইন্ডার হিসেবে ল্যাকটোজ ব্যবহার করা হয়। তবে পরিমাণ কম। বেশিরভাগ মানুষের সমস্যা হয় না। 

তবু যদি খুব সেনসিটিভ হন, তাহলে ডাক্তার বা ফার্মাসিস্টকে জানান। ল্যাকটোজ-ফ্রি ওষুধের বিকল্প থাকতে পারে। কফি ক্রিমার আর হুইপড ক্রিমেও ল্যাকটোজ থাকে। কফি খেতে গেলে ব্ল্যাক কফিই নিরাপদ। নাহলে বাদামের দুধ বা সয়া দুধ দিয়ে বানান। হুইপড ক্রিম তো দুধ দিয়েই তৈরি। তাই কেকের উপরের ক্রিম খাওয়ার আগে একবার ভাবুন। একটু স্বাদ নিতে গিয়ে পুরো দিন নষ্ট হতে পারে। শেষে একটা কথা। ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স মানে এই না যে সব কিছু বাদ দিতে হবে। কিছু মানুষ সামান্য পরিমাণে ল্যাকটোজ সহ্য করতে পারেন। এক গ্লাস দুধ না খেয়ে আধা গ্লাস খেলে সমস্যা হয় না। দুধ খাওয়ার সঙ্গে খাবার খেলে হজম একটু ধীর হয়। 

তাই সমস্যা কম হয়। ল্যাকটেজ এনজাইম ট্যাবলেট খেয়ে দুধ খেলেও অনেকে ঠিকঠাক থাকেন। তবে সবার ক্ষেত্রে একই নিয়ম কাজ করে না। আপনার শরীর কী বলে, সেটাই শুনুন। একটু ট্রায়াল আর এরর করুন। দেখুন কোন পরিমাণে আপনার শরীর সহ্য করে। তারপর সেই অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস সাজান। কারণ জীবন তো থামবে না। দুধ ছাড়াও অনেক সুন্দর খাবার আছে। শুধু একটু জানতে হবে, একটু খেয়াল করতে হবে।

দুধে এলার্জি থাকলে কী কী বিকল্প খাবেন

দুধে এলার্জি থাকলে কী কী বিকল্প খাবেন-এই প্রশ্নের উত্তর জানা থাকলে জীবন অনেক সহজ হয়ে যায়। কারণ দুধে এলার্জি মানে শুধু দুধ নয়, দুধের প্রোটিন সব জায়গায় লুকিয়ে থাকে। তাই বিকল্প খোঁজাটা একটু বেশি সতর্কতা চায়। তবে চিন্তার কিছু নেই। পৃথিবীতে দুধ ছাড়াও পুষ্টির ভাণ্ডার ভর্তি। প্রথমেই আসে দুধের বিকল্প। সয়া দুধ, বাদামের দুধ, ওটসের দুধ, চালের দুধ-এসব এখন বাজারে প্রচুর পাওয়া যায়। সয়া দুধে প্রোটিন বেশি। বাদামের দুধে ভিটামিন ই আর ম্যাগনেসিয়াম থাকে। ওটসের দুধে ফাইবার ভরপুর। চালের দুধ সবচেয়ে হালকা, হজমেও সহজ। তবে একটা কথা মাথায় রাখুন। দুধে এলার্জি থাকলে ছাগলের দুধ বা ভেড়ার দুধও এড়িয়ে চলতে হবে। কারণ এসব দুধেও একই রকম প্রোটিন থাকে।

শরীর সেগুলোকেও শত্রু ভাবে। তাই শুধু গরুর দুধ বাদ দিলেই চলবে না, সব ধরনের পশুর দুধ থেকে দূরে থাকতে হবে। ক্যালসিয়ামের বিকল্প খোঁজাটা জরুরি। দুধ ছাড়া ক্যালসিয়াম পাওয়া যায় অনেক জায়গায়। পালং শাক, সরিষা শাক, মেথি শাক-এসব সবুজ শাকসবজিতে ক্যালসিয়াম প্রচুর। এক কাপ পালং শাকে দুধের সমান ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়। ছোলা, মটরশুটি, রাজমা-এসব শুষ্ক বীজেও ক্যালসিয়াম ভরপুর। বাদাম, কাজু, কাঠবাদাম, তিল-এসব একটু করে খেলেই দিনের চাহিদা পূরণ হয়। সার্ডিন মাছের হাড়েও ক্যালসিয়াম থাকে। তাই হাড়সহ ভেজে খান। তবে ভালো করে নরম করতে হবে, নাহলে হজম হয় না। ক্যালসিয়াম ফর্টিফাইড জুস বা সিরিয়ালও পাওয়া যায়। 

তবে লেবেল পড়ে নিন, কতটুকু ক্যালসিয়াম আছে। প্রোটিনের বিকল্পও প্রচুর আছে। ডিম একটা চমৎকার উৎস। একটা ডিমে ছয় গ্রাম প্রোটিন থাকে। আর সব ভিটামিনও পাওয়া যায়। মাছ, মাংস, মুরগি-এসবেও প্রোটিন ভরপুর। শাকসবজির মধ্যে ছোলা, মটর, বিনস, টফু-এসবে প্রোটিন বেশি। কুইনোয়া একটা সুপারফুড। এতে সব অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে। তাই নিরামিষ খাবারেও পূর্ণাঙ্গ প্রোটিন পাওয়া যায়। আমাদের দেশে ডাল ভাত তো আছেই। মুসুর ডাল, মুগ ডাল, মাসকলাই ডাল-এসবেও প্রোটিন আছে। তাই দুধ ছাড়লেই শরীর শুকিয়ে যাবে না। ভিটামিন ডি-র কথা বলতে হবে। দুধে ভিটামিন ডি ফর্টিফাইড করা থাকে। দুধ না খেলে এই ভিটামিনের ঘাটতি হতে পারে। 

তাই সকালের রোদে একটু হাঁটুন। ডিমের কুসুম, মাছের তেল, মাশরুম-এসবেও ভিটামিন ডি থাকে। কিছু মানুষ সাপ্লিমেন্ট খান। তবে ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া খাবেন না। বেশি ভিটামিন ডি শরীরের জন্য ক্ষতিকর। শিশুদের ক্ষেত্রে বিকল্প খাবার একটু ভিন্ন। দুধে এলার্জি থাকলে মায়েরা হাইড্রোলাইজড ফর্মুলা দুধ ব্যবহার করেন। এতে প্রোটিন ভেঙে ছোট ছোট অংশে ভাগ করা থাকে। শরীর আর শত্রু ভাবে না। অ্যামিনো অ্যাসিড ভিত্তিক ফর্মুলাও আছে। এতে প্রোটিন একদম ভেঙে ফেলা হয়। তবে স্বাদ একটু তেতো হয়। শিশুরা শুরুতে মানতে চায় না। ধৈর্য ধরতে হয়। কিছুদিন পর অভ্যস্ত হয়ে যায়। বড় হলে সয়া দুধ বা বাদামের দুধ দেওয়া যায়। তবে এক বছরের আগে সয়া দুধ দেওয়া উচিত নয়। 

ডাক্তারের পরামর্শ নিন। বেকারি আর প্রসেসড খাবারে একটু বেশি সতর্ক থাকতে হবে। কেক, বিস্কুট, পেস্ট্রি, ব্রেড-এসবে দুধের পাউডার মেশানো থাকে। চকলেটেও দুধ থাকে। তাই লেবেল পড়ে নিন। "কেসিন", "হুই", "মিল্ক সলিডস", "বাটারমিল্ক"-এসব শব্দ দেখলে বুঝবেন দুধ আছে। রেস্তোরাঁয় খেতে গেলে জিজ্ঞেস করুন। দুধ দিয়ে তৈরি কিনা। একটু লজ্জা পাবেন না। আপনার জীবনের প্রশ্ন। কিছু রেস্তোরাঁয় এলার্জি কার্ড দেওয়া যায়। সেখানে লেখা থাকে আপনি কী কী এড়িয়ে চলবেন। 

ওয়েটারকে দেখালেই বুঝে যাবে। ঘরে রান্না করলে সবচেয়ে নিরাপদ। নিজের হাতে তৈরি করলে কী দিলেন, কী দিলেন না-সব জানা থাকে। দুধের বদলে সয়া দুধ দিয়ে পায়েস বানান। বাদামের দুধ দিয়ে স্মুদি তৈরি করুন। নারকেল দুধ দিয়ে কারি রান্না করুন। স্বাদ একটু ভিন্ন হবে, তবে অভ্যস্ত হয়ে যাবেন। আসলে অভ্যাসটাই বড় কথা। একটু সময় লাগে, কিন্তু সম্ভব।

শেষ কথাঃ লেখকের মন্তব্য

আমার এই লেখাটা লিখতে গিয়ে বারবার একটা কথা মনে হয়েছে। আমাদের শরীর কিন্তু বেশ কথা বলে। পেট ফোলা, ত্বকে র‍্যাশ, শ্বাসকষ্ট-এসবই তার ভাষা। কিন্তু আমরা শুনি না। ভাবি হয়তো আবহাওয়ার দোষ, হয়তো সকালের চা ভারি হয়েছে। কিন্তু বারবার একই সমস্যা হলে একবার ভেবে দেখুন। শরীর কী বলতে চাইছে? দুধে এলার্জি আর ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স-দুটোই সাধারণ সমস্যা। তবে একটা জীবনঝুঁকি তৈরি করতে পারে, আরেকটা শুধু অস্বস্তি দেয়। তাই ভুল বোঝাবুঝি কখনো করবেন না। নিজে নিজে চিকিৎসা করার চেয়ে একবার বিশেষজ্ঞের কাছে গিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিন। রক্ত পরীক্ষা, ত্বকের পরীক্ষা-এসব একদম স্পষ্ট করে দেয় আপনার সমস্যাটা কী।

আর দুধ ছাড়লেই জীবন শেষ হয় না। পৃথিবীতে এতো খাবার, এতো বৈচিত্র্য। শুধু একটু জানতে হবে, একটু খেয়াল করতে হবে। শিশু থেকে বৃদ্ধ-সবার জন্যই পুষ্টির ব্যবস্থা আছে। বিকল্প দুধ, সবুজ শাক, বাদাম, মাছ-এসবেই ক্যালসিয়াম আর প্রোটিন ভরপুর। সবচেয়ে বড় কথা হলো সচেতনতা। রেস্তোরাঁয় খেতে গেলে লেবেল পড়ুন। জিজ্ঞেস করুন। একটু লজ্জা পাবেন না। আপনার শরীর, আপনার অধিকার। আর যদি কখনো গুরুতর প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, দেরি না করে হাসপাতালে ছুটুন। 

সময় মতো চিকিৎসা পেলে জীবন বাঁচে। এটা কোনো ছোট কথা নয়। শেষে একটা কথাই বলব। শরীরের কথা শুনুন। সে সবচেয়ে ভালো জানে কী তার জন্য ভালো, কী খারাপ। আর সুস্থ থাকুন। কারণ সুস্থতাই সবচেয়ে বড় সম্পদ। বাকি সব তো আসবে, যাবে। কিন্তু শরীর একটাই। তাকে ভালো রাখুন।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

ইনফোনেস্টইনের শর্তাবলী মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট পর্যাবেক্ষন করা হয়।

comment url

Author Bio

Author
Akther Hossain

একজন ডিজিটাল মার্কেটিং এক্সপার্ট ও ইনফোনেস্টইন লিমিটেড এর সিইও। SEO, ব্লগিং, অনলাইন ইনকাম ও টেকনোলজি নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন। তার লক্ষ্য – পাঠকদের ডিজিটাল ক্যারিয়ারে সফল হতে সহায়তা করা।