গর্ভাবস্থায় এলার্জি হলে কী করবেন
গর্ভাবস্থায় এলার্জি হলে কী করবেন-এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন? সঠিক তথ্য জেনে
নিলে অযথা দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমে যায়। কোন লক্ষণকে স্বাভাবিক ধরা যায়, আর কখন
দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত, তা সহজ ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। নিরাপদ যত্নের সহজ গাইড।
ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা বিভ্রান্তিকর তথ্যের বদলে বাস্তব জীবনে কাজে লাগবে এমন
পরামর্শই এখানে গুরুত্ব পেয়েছে। কেনার মতো কোনো পণ্য নয়, বরং মা ও অনাগত শিশুর
নিরাপত্তাকে সামনে রেখে প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। শেষ
পর্যন্ত পড়লেই সব জানা যাবে।
পোস্ট সূচিপত্রঃ গর্ভাবস্থায় এলার্জি হলে কী করবেন
গর্ভাবস্থায় এলার্জি হলে কী করবেন
গর্ভাবস্থায় এলার্জি হলে কী করবেন-এই প্রশ্নটা আজকাল প্রায় প্রতিটা হবু মায়ের
মনে ঘুরপাক খায়। শরীরটা এমনিতেই এই সময় কতটা সংবেদনশীল হয়ে যায়, তা তো আপনি
নিজেই টের পাচ্ছেন। তার ওপর হঠাৎ চুলকানি, হাঁচি বা ত্বকে র্যাশ দেখা দিলে ভয়
পাওয়াটা স্বাভাবিক। আসুন, একদম সহজ ভাষায় বুঝে নিই ব্যাপারটা।
কেন গর্ভাবস্থায় এলার্জি বেড়ে যায়ঃ হরমোনের ওঠানামা এখানে বড় ভূমিকা রাখে।
ইস্ট্রোজেন আর প্রোজেস্টেরনের মাত্রা বদলে যাওয়ার কারণে আপনার ইমিউন সিস্টেম
আগের চেয়ে বেশি সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। যে ধুলাবালি বা খাবার আগে কোনো সমস্যা করত
না, সেটাই এখন প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। শরীর যেন নতুন করে সব কিছু চিনতে
শুরু করে, অনেকটা এরকম।
গর্ভাবস্থায় এলার্জির সাধারণ লক্ষণঃ
- নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া বা ঘন ঘন হাঁচি
- চোখ চুলকানো বা লাল হয়ে যাওয়া
- ত্বকে র্যাশ, চুলকানি বা লালচে ভাব
- শ্বাস নিতে সামান্য কষ্ট অনুভব করা
- মাঝে মাঝে মাথাব্যথা বা ক্লান্তি
এই লক্ষণগুলো হালকা মনে হলেও, অবহেলা করার সুযোগ নেই। কারণ আপনার শরীরের প্রতিটা
প্রতিক্রিয়া সরাসরি বাচ্চার সাথেও যুক্ত।
গর্ভাবস্থায় এলার্জি হলে যা করবেনঃ
- প্রথমেই আতঙ্কিত হবেন না। বেশিরভাগ এলার্জিই সাময়িক এবং নিয়ন্ত্রণযোগ্য।
- নিজে থেকে কোনো ওষুধ বা অ্যান্টিহিস্টামিন খাবেন না। গর্ভাবস্থায় প্রতিটা ওষুধের প্রভাব আলাদা, তাই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কিছুই খাওয়া ঠিক না।
- যে জিনিসটা থেকে এলার্জি হচ্ছে বলে সন্দেহ হয়, সেটা এড়িয়ে চলুন। ধুলা, নির্দিষ্ট খাবার, পারফিউম বা পোষা প্রাণীর লোম হতে পারে কারণ।
- ঘর পরিষ্কার রাখুন এবং নিয়মিত বিছানার চাদর বদলান। এলার্জেন জমতে দেবেন না।
- হালকা গরম পানি দিয়ে নাক পরিষ্কার করলে আরাম পেতে পারেন।
- লক্ষণ বাড়তে থাকলে বা শ্বাসকষ্ট হলে দেরি না করে দ্রুত ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন।
কখন সরাসরি ডাক্তারের কাছে যাবেনঃ শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, মুখ বা ঠোঁট ফুলে যাচ্ছে,
কিংবা র্যাশ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে-এমন কিছু দেখলে অপেক্ষা করার প্রশ্নই আসে না।
এগুলো গুরুতর এলার্জিক প্রতিক্রিয়ার লক্ষণ হতে পারে। আপনার আর বাচ্চার
নিরাপত্তার জন্য সাথে সাথে হাসপাতালে যোগাযোগ করুন। নিজের শরীরের কথা মন দিয়ে
শুনুন, আর ছোট ছোট লক্ষণকেও গুরুত্ব দিন। ঘরোয়া সতর্কতা অনেক সময় কাজ দেয়,
কিন্তু ওষুধের ব্যাপারে কখনোই নিজে সিদ্ধান্ত নেবেন না। ডাক্তারের পরামর্শই এখানে
সবচেয়ে নিরাপদ পথ। এই সময়টা যতটা সম্ভব নিশ্চিন্তে কাটানোর চেষ্টা করুন, বাকিটা
শরীরই সামলে নেবে।
গর্ভাবস্থায় এলার্জির লক্ষণ
সকালে ঘুম থেকে উঠেই হঠাৎ নাক বন্ধ, চোখ চুলকাচ্ছে... আপনার সাথেও কি এমন হচ্ছে
আজকাল? গর্ভাবস্থায় এই ধরনের ছোটখাটো পরিবর্তন একদম স্বাভাবিক ব্যাপার। তবে
গর্ভাবস্থায় এলার্জি হলে কী করবেন, সেটা বোঝার আগে লক্ষণগুলো ঠিকমতো চেনা দরকার।
কারণ চেনা না থাকলে সাধারণ ঠান্ডা আর এলার্জি গুলিয়ে ফেলা খুবই স্বাভাবিক। নাক
দিয়ে পানি পড়া বা বারবার হাঁচি আসা প্রথম দিকের লক্ষণগুলোর মধ্যে অন্যতম। অনেক
সময় মনে হয় সর্দি লেগেছে, অথচ আসলে এটা এলার্জেনের প্রতিক্রিয়া। ধুলাবালি,
ফুলের রেণু বা পারফিউমের গন্ধেও এই সমস্যা শুরু হতে পারে। আপনি যদি খেয়াল করেন,
নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় গেলেই লক্ষণগুলো বেড়ে যায়, তাহলে বুঝবেন এটাই কারণ।
ত্বকের সমস্যাও কম দেখা যায় না। হঠাৎ শরীরে লালচে র্যাশ, চুলকানি বা ফুসকুড়ি
উঠতে পারে, বিশেষ করে হাত-পায়ের ভাঁজে। গরমকালে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়। কারো
কারো ক্ষেত্রে সামান্য চুলকানি থেকেই সারা শরীরে অস্বস্তি ছড়িয়ে যায়। চোখ লাল
হয়ে যাওয়া, পানি পড়া বা চুলকানি অনুভব করাও একটা কমন লক্ষণ। অনেকে ভাবেন চোখে
ধুলা পড়েছে, কিন্তু আসলে এটা এলার্জিক কনজাংটিভাইটিসের লক্ষণ হতে পারে। ঘুম থেকে
উঠে চোখ ফোলা ফোলা লাগলেও সেটা এলার্জির দিকেই ইঙ্গিত করে। শ্বাসকষ্ট বা বুকে চাপ
চাপ ভাব হলে একটু সতর্ক হওয়া দরকার। হালকা শ্বাসকষ্ট থেকে শুরু হয়ে অনেক সময়
এটা বেড়ে যেতে পারে।
বিশেষ করে যাদের আগে থেকে হাঁপানির সমস্যা আছে, তাদের এই লক্ষণ নিয়ে একটুও
অবহেলা করা উচিত না। মাথাব্যথা, ক্লান্তি বা অস্থির লাগাও এলার্জির পরোক্ষ লক্ষণ
হতে পারে। শরীর যখন এলার্জেনের সাথে লড়াই করে, তখন এনার্জি অনেকটাই খরচ হয়ে
যায়। তাই সারাদিন অকারণে ক্লান্ত লাগলে, শুধু গর্ভাবস্থার ক্লান্তি ভেবে উড়িয়ে
দেবেন না।
গর্ভাবস্থায় এলার্জির কারণ
গর্ভাবস্থায় হঠাৎ এলার্জি শুরু হলে অনেকেই ভাবেন, "আগে তো কখনো এমন হয়নি!" আসলে
এর পেছনে বড় কারণ হরমোনের পরিবর্তন। ইস্ট্রোজেন আর প্রোজেস্টেরনের মাত্রা বেড়ে
যাওয়ায় আপনার ইমিউন সিস্টেম আগের চেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে সাধারণ
জিনিসও শরীর এখন হুমকি হিসেবে ধরে নেয়। রক্তনালীর প্রসারণও এখানে একটা বড়
ভূমিকা রাখে। গর্ভাবস্থায় রক্ত সঞ্চালন বেড়ে যাওয়ার কারণে নাকের ভেতরের ঝিল্লি
ফুলে যায়। একেই বলে "প্রেগন্যান্সি রাইনাইটিস", যা দেখতে ঠিক এলার্জির মতোই
লাগে। আপনি হয়তো ভাবছেন সর্দি লেগেছে, কিন্তু আসল কারণ এটাই। পরিবেশগত কারণও
অবহেলা করার সুযোগ নেই।
আরো পড়ুনঃ থাইরয়েড রোগীর ওজন কমানোর ডায়েট চার্ট
ধুলাবালি, ফুলের রেণু, পোষা প্রাণীর লোম বা নির্দিষ্ট পারফিউমের গন্ধ আগে সহ্য
হলেও, এখন সেটাই সমস্যা তৈরি করতে পারে। শরীরের সংবেদনশীলতা বেড়ে যাওয়ায় ছোট
ছোট জিনিসও বড় প্রতিক্রিয়া ডেকে আনে। খাবারের এলার্জিও গর্ভাবস্থায় নতুন করে
দেখা দিতে পারে। যে খাবার আগে নির্বিঘ্নে খেতেন, সেটাই এখন চুলকানি বা র্যাশের
কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। শরীরের ভেতরের পরিবর্তনের সাথে সাথে হজম প্রক্রিয়া আর
ইমিউন রেসপন্সও বদলে যায়। মানসিক চাপ আর দুর্বল ইমিউন সিস্টেমও এলার্জি বাড়িয়ে
দিতে পারে। গর্ভাবস্থায় শরীর এমনিতেই অনেক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়, তাই
স্ট্রেস বাড়লে প্রতিক্রিয়াও বাড়ে। তাই যতটা সম্ভব নিজেকে শান্ত আর চাপমুক্ত
রাখার চেষ্টা করুন।
এলার্জি কমানোর ঘরোয়া উপায়
ওষুধ ছাড়াই অনেক সময় এলার্জি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, জানেন? গর্ভাবস্থায়
যেহেতু ওষুধ খাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হয়, তাই ঘরোয়া উপায়গুলোই আপনার
প্রথম ভরসা হতে পারে। ছোট ছোট অভ্যাস বদলালেই অনেকটা স্বস্তি পাওয়া যায়। চলুন
দেখে নেই কী কী করতে পারেন। ঘর পরিষ্কার রাখাটা সবার আগে জরুরি। ধুলাবালি জমতে
দেবেন না, বিশেষ করে বিছানার চাদর আর বালিশের কভার নিয়মিত বদলান। জানালার পর্দাও
মাঝেমধ্যে ধুয়ে ফেলুন, কারণ এখানেই এলার্জেন সবচেয়ে বেশি জমে। ঘরে বাতাস
চলাচলের ব্যবস্থা রাখলেও অনেকটা উপকার পাবেন। নাক বন্ধ থাকলে হালকা গরম পানির ভাপ
নিতে পারেন। এতে নাকের ভেতরের ফোলাভাব কমে আসে আর শ্বাস নিতেও আরাম লাগে।
চাইলে স্যালাইন ওয়াটার দিয়ে নাক ধুয়ে নেওয়ার অভ্যাসও করতে পারেন। এটা একদম
নিরাপদ আর প্রাকৃতিক পদ্ধতি। খাবারের দিকেও একটু নজর দিন। যে খাবারে আগে কখনো
এলার্জি হয়নি, সেটাও এখন সমস্যা করতে পারে, তাই নতুন কিছু খাওয়ার আগে সতর্ক
থাকুন। প্রচুর পানি খান, এতে শরীরের টক্সিন বের হতে সাহায্য করে। তাজা ফল আর সবজি
বেশি রাখুন খাদ্যতালিকায়। মধু আর আদা চা অনেকের জন্যই আরামদায়ক হতে পারে। গলা
খুসখুস বা হালকা কাশি থাকলে এই দুটো জিনিস দারুণ কাজ দেয়। তবে গর্ভাবস্থায়
যেকোনো নতুন কিছু খাওয়ার আগে একবার ডাক্তারের সাথে কথা বলে নেওয়াই ভালো।
চাপমুক্ত থাকাটাও কম গুরুত্বপূর্ণ না। মানসিক চাপ বাড়লে শরীরের প্রতিক্রিয়াও
বেড়ে যায়, তাই হালকা হাঁটাহাঁটি বা শ্বাসের ব্যায়াম করার চেষ্টা করুন।
পর্যাপ্ত ঘুমও এলার্জি নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখে। নিজের শরীরের কথা শুনুন, আর
ছোট ছোট যত্নই আপনাকে অনেকটা স্বস্তি দেবে।
এলার্জিতে কী খাবেন
এলার্জি হলে অনেকেই বুঝতে পারেন না কী খাবেন, কী খাবেন না। খাবারের তালিকাটা একটু
গুছিয়ে নিলেই শরীর অনেকটা হালকা লাগে। আপনি যদি সঠিক খাবার বেছে নেন, তাহলে
অস্বস্তি অনেকটাই কমে আসবে। প্রথমেই বলি ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবারের কথা। কমলা,
লেবু, আমলকি এসব খাবার শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করে। নিয়মিত এসব খেলে
এলার্জির প্রতিক্রিয়া কিছুটা কম হয়। ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডযুক্ত খাবারও দারুণ
কাজ দেয়। মাছ, আখরোট বা তিসির বীজ খেতে পারেন নিয়মিত। এগুলো শরীরের প্রদাহ
কমাতে সাহায্য করে, যা গর্ভাবস্থায় এলার্জি হলে কী করবেন তার একটা ভালো সমাধান
হতে পারে।
আদা আর হলুদও রাখুন প্রতিদিনের খাবারে। এই দুটো উপাদান প্রাকৃতিকভাবে প্রদাহ
কমায় আর শরীরকে ভেতর থেকে সুস্থ রাখে। চায়ে বা রান্নায় সহজেই এগুলো যোগ করতে
পারেন। দই বা প্রোবায়োটিক জাতীয় খাবারও ভুলে যাবেন না। পেটের ভালো ব্যাকটেরিয়া
বাড়াতে এগুলো সাহায্য করে, যা ইমিউন সিস্টেমের জন্য জরুরি। প্রতিদিন এক বাটি
টাটকা দই খেলে অনেক উপকার পাবেন। প্রচুর পানি খাওয়ার কথাও মনে রাখবেন। শরীর
হাইড্রেটেড থাকলে টক্সিন বের হয়ে যায় সহজে, আর এলার্জেনের প্রভাবও কমে। সবশেষে
বলব, বাদাম বা শেলফিশে যদি আগে থেকেই এলার্জি থাকে, সেগুলো এড়িয়ে চলুন
সম্পূর্ণভাবে।
যেসব খাবার এড়িয়ে চলবেন
এলার্জি থাকলে কিছু খাবার একদম এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ। আপনি হয়তো ভাবছেন,
একটু খেলে কী আর হবে... কিন্তু গর্ভাবস্থায় শরীরের প্রতিক্রিয়া কখন কীভাবে বদলে
যায়, বলা মুশকিল। তাই সচেতন থাকাটাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ। বাদাম জাতীয় খাবার
নিয়ে একটু সতর্ক থাকুন। চিনাবাদাম, কাজু বা আখরোটে যদি আগে থেকেই এলার্জির
ইতিহাস থাকে, তাহলে গর্ভাবস্থায় এগুলো একদম এড়িয়ে চলুন। নতুন করে পরীক্ষা করে
দেখার এই সময়টা মোটেও উপযুক্ত না। সামুদ্রিক খাবার, বিশেষ করে চিংড়ি বা
কাঁকড়ার মতো শেলফিশও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে এসব খাবার থেকে হঠাৎ
চুলকানি বা র্যাশ দেখা দেয়।
আপনার আগে কখনো সমস্যা না হলেও, গর্ভাবস্থায় নতুন করে প্রতিক্রিয়া শুরু হতে
পারে। প্রক্রিয়াজাত খাবার আর কৃত্রিম রং-স্বাদযুক্ত খাবারও যতটা সম্ভব এড়িয়ে
চলুন। চিপস, সফট ড্রিংক বা প্যাকেটজাত জুসে থাকা প্রিজারভেটিভ শরীরে এলার্জিক
প্রতিক্রিয়া বাড়িয়ে দিতে পারে। তাজা আর ঘরে তৈরি খাবারই এই সময় সবচেয়ে
নিরাপদ। দুগ্ধজাত খাবারেও কারো কারো সমস্যা হতে পারে। দুধ, পনির বা মাখন খাওয়ার
পর যদি পেট ফাঁপা, চুলকানি বা অস্বস্তি অনুভব করেন, তাহলে বুঝবেন এটাই কারণ।
আরো পড়ুনঃ বর্ষাকালে ডেঙ্গু প্রতিরোধে কী করবেন
এমন লক্ষণ দেখলে সাথে সাথে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়াই ভালো। গমজাতীয় খাবার বা
গ্লুটেনযুক্ত খাবারও কারো কারো ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করে। রুটি, পাস্তা বা বেকারি
আইটেম খাওয়ার পর যদি পেটে সমস্যা অনুভব করেন, তাহলে একটু কমিয়ে দেখুন। শরীর
কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, সেটা খেয়াল রাখাটাই আসল কাজ।
এলার্জির ওষুধ খাওয়ার নিয়ম
এলার্জির কষ্ট সহ্য করতে করতে অনেকেই নিজে থেকে ওষুধ খেয়ে ফেলেন। কিন্তু
গর্ভাবস্থায় এলার্জি হলে কী করবেন, তার উত্তর কখনোই "নিজে থেকে ওষুধ খাওয়া" হতে
পারে না। এই সময় প্রতিটা ওষুধের প্রভাব মা আর সন্তান দুজনের জন্যই আলাদা হতে
পারে। দোকান থেকে কিনে সাধারণ অ্যান্টিহিস্টামিন খেয়ে ফেলাটা অনেকের কাছে সহজ
সমাধান মনে হয়। কিন্তু গর্ভাবস্থায় প্রতিটা ওষুধ শরীরে কীভাবে কাজ করবে, তা
একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম। তাই লক্ষণ যতই বিরক্তিকর লাগুক না কেন, নিজে
সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকুন। ডাক্তার যদি কোনো ওষুধ লিখে দেন, তাহলে সেটা
ঠিক তার বলে দেওয়া নিয়ম মেনেই খান।
মাত্রা কমানো বা বাড়ানো, কিংবা নিজে থেকে বন্ধ করে দেওয়া মোটেও ঠিক না। শরীর
কেমন সাড়া দিচ্ছে, সেটাও ডাক্তারকে নিয়মিত জানানো উচিত। গর্ভাবস্থার কোন সময়ে
আছেন, সেটাও ওষুধ নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলে। প্রথম তিন মাসে যে সতর্কতা দরকার,
শেষ তিন মাসে সেটা ভিন্ন হতে পারে। তাই ডাক্তার আপনার পুরো অবস্থা জেনেই সবচেয়ে
নিরাপদ পথটা বেছে দেবেন। কোনো ওষুধ খাওয়ার পর অস্বাভাবিক কিছু অনুভব করলে দেরি
না করে জানান।
মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব বা অতিরিক্ত ক্লান্তি লাগলে সেটা উপেক্ষা করবেন না। আপনার
শরীরের প্রতিটা সংকেতই গুরুত্বপূর্ণ, তাই সেটা ডাক্তারকে খুলে বলুন। সবচেয়ে ভালো
নিয়ম হলো, নিজে থেকে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করা। ওষুধ, ভিটামিন বা
সাপ্লিমেন্ট, যা-ই খেতে চান না কেন, একবার ডাক্তারের সাথে আলোচনা করে নিন। এই
সাবধানতাটুকুই আপনাকে আর আপনার সন্তানকে সবচেয়ে বেশি নিরাপদ রাখবে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
সব এলার্জিই যে বাসায় বসে সামলানো যায়, তা কিন্তু না। কিছু লক্ষণ দেখলে দেরি না
করে সরাসরি ডাক্তারের কাছে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। আপনি নিজেই ভালো বুঝবেন, কখন
শরীর স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কিছু বলছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হলে বা বুকে চাপ চাপ ভাব
অনুভব করলে একদম অপেক্ষা করবেন না। এটা সাধারণ এলার্জির লক্ষণ না হয়ে গুরুতর
কিছুর ইঙ্গিতও হতে পারে। বিশেষ করে যদি কথা বলতেও কষ্ট হয়, তাহলে সাথে সাথে
হাসপাতালে যোগাযোগ করুন। মুখ, ঠোঁট বা গলা হঠাৎ ফুলে উঠলে সেটাকে হালকাভাবে
নেওয়ার সুযোগ নেই। এই ধরনের লক্ষণ মাঝেমধ্যে খুব দ্রুত বিপজ্জনক অবস্থায় পৌঁছে
যায়।
আরো পড়ুনঃ কম বয়সে চুল পাকার কারণ
দেরি করলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে যেতে পারে, তাই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াটাই নিরাপদ।
শরীরে র্যাশ বা চুলকানি যদি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, তাহলেও সতর্ক হোন। ছোট একটা
জায়গা থেকে শুরু হয়ে যদি সারা শরীরে ছড়িয়ে যায়, এটা শরীরের তীব্র
প্রতিক্রিয়ার লক্ষণ। এমন অবস্থায় ঘরোয়া উপায়ে ভরসা না রেখে চিকিৎসকের পরামর্শ
নিন। বাচ্চার নড়াচড়া কমে যাওয়া বা অস্বাভাবিক কিছু অনুভব করলেও সাথে সাথে
জানান ডাক্তারকে।
এলার্জির প্রতিক্রিয়া মাঝে মাঝে পরোক্ষভাবে বাচ্চার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই
নিজের শরীরের পাশাপাশি বাচ্চার অবস্থাও খেয়াল রাখুন সবসময়। জ্বর, তীব্র
মাথাব্যথা বা অতিরিক্ত দুর্বলতা অনুভব করলেও অবহেলা করবেন না। এগুলো সাধারণ
এলার্জির লক্ষণের চেয়ে বেশি কিছু হতে পারে। সন্দেহ হলেই দেরি না করে ডাক্তারের
কাছে যাওয়া, এটাই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
এলার্জি প্রতিরোধের উপায়
গর্ভাবস্থায় এলার্জি হলে কী করবেন, তার চেয়ে ভালো প্রশ্ন হলো-শুরুতেই কীভাবে
ঠেকানো যায়? প্রতিরোধ সবসময় চিকিৎসার চেয়ে সহজ আর নিরাপদ। কিছু ছোট অভ্যাস
মেনে চললে অনেকটাই এড়িয়ে যেতে পারবেন এই সমস্যা। ঘরের পরিবেশ পরিষ্কার রাখাটা
সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ। নিয়মিত ঝাড়পোঁছ করুন, বিছানার চাদর বদলান সপ্তাহে অন্তত
একবার। ধুলাবালি জমে থাকলে সেটাই বারবার এলার্জি ডেকে আনে, তাই এই অভ্যাসে ফাঁকি
দেবেন না। যেসব জিনিসে আগে থেকে এলার্জি আছে বলে জানেন, সেগুলো থেকে দূরে থাকুন
সচেতনভাবে। পোষা প্রাণীর কাছাকাছি যাওয়া, নির্দিষ্ট পারফিউম বা ফুলের কাছে
বেশিক্ষণ থাকা এড়িয়ে চলুন।
নিজের ট্রিগার চিনে রাখাটাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা। বাইরে থেকে ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে
নেওয়ার অভ্যাস করুন। এতে বাইরের ধুলাবালি বা পরাগরেণু শরীরে বেশিক্ষণ থাকার
সুযোগ পায় না। পোশাকও বদলে ফেলুন যত দ্রুত সম্ভব, বিশেষ করে ধুলাবালিপূর্ণ
জায়গা থেকে ফিরলে। সুষম খাবার আর পর্যাপ্ত ঘুম শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী
রাখে। যত শরীর সুস্থ থাকবে, এলার্জির প্রতিক্রিয়াও তত কম হবে। তাই খাদ্যাভ্যাস
আর বিশ্রামের দিকে বাড়তি নজর দিন এই সময়টায়। নিয়মিত ডাক্তারের সাথে চেকআপে
যাওয়াটাও ভুলে যাবেন না। ছোটখাটো পরিবর্তনও যদি ডাক্তারের নজরে আসে, তাহলে বড়
সমস্যা হওয়ার আগেই সেটা ধরা পড়ে। প্রতিরোধই শেষ পর্যন্ত আপনাকে সবচেয়ে নিরাপদ
রাখবে।
শেষ কথাঃ লেখকের মন্তব্য
গর্ভাবস্থার এই সময়টা যতটা আনন্দের, ততটাই কিছুটা উদ্বেগেরও। শরীরে ছোট ছোট
পরিবর্তন দেখলে মন খারাপ হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিশ্বাস করুন, এলার্জির
বেশিরভাগ সমস্যাই একটু সচেতন থাকলে সামলে নেওয়া যায়। আপনি নিজের শরীরকে যতটা
ভালো চেনেন, আর কেউ ততটা চেনে না। তাই কোনো লক্ষণ অস্বাভাবিক লাগলে সেটা এড়িয়ে
না গিয়ে গুরুত্ব দিন। ছোট একটা সতর্কতাই অনেক সময় বড় সমস্যা থেকে বাঁচিয়ে
দেয়।
ঘরোয়া উপায় আর সাধারণ সতর্কতা মেনে চললে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বস্তি পাওয়া
যায়। তবে ওষুধ বা চিকিৎসার ব্যাপারে কখনোই নিজে সিদ্ধান্ত নেবেন না। ডাক্তারের
পরামর্শই এখানে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ, এটা মাথায় রাখুন সবসময়। এই লেখাটা
লিখতে বসে বারবার একটা কথাই মনে হয়েছে গর্ভাবস্থা মানেই শুধু শারীরিক পরিবর্তন
না, এটা একটা মানসিক যাত্রাও বটে। তাই নিজের প্রতি একটু নরম হোন, নিজেকে সময়
দিন।
শেষে এটাই বলব, প্রতিটা শরীর আলাদা, প্রতিটা অভিজ্ঞতাও আলাদা। তাই অন্য কারো সাথে
নিজের অবস্থা তুলনা করার দরকার নেই। নিজের শরীরের কথা শুনুন, ডাক্তারের পরামর্শ
মানুন, আর বাকিটা সময়ের হাতে ছেড়ে দিন।




ইনফোনেস্টইনের শর্তাবলী মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট পর্যাবেক্ষন করা হয়।
comment url