সকালে বরফ পানিতে মুখ ডোবানোর উপকারিতা
সকালে বরফ পানিতে মুখ ডোবানোর উপকারিতা সম্পর্কে অনেকেই কৌতূহলী, কিন্তু আসল
সত্যটা জানেন খুব কম মানুষ। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের এই অভ্যাস আপনার ত্বকে কী
ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে, তা জানলে অবাক হতে পারেন। এটি সতেজ হওয়ার সহজ উপায়।
তবে সব ক্ষেত্রেই একই ফল নাও মিলতে পারে, তাই কোন বিষয়গুলো মাথায় রাখা উচিত,
সেটাও জানা জরুরি। এই গাইডে সহজ ভাষায় সম্ভাব্য উপকারিতা, সীমাবদ্ধতা এবং
সঠিকভাবে করার নিয়ম তুলে ধরা হয়েছে।
পোস্ট সূচিপত্রঃ সকালে বরফ পানিতে মুখ ডোবানোর উপকারিতা
- সকালে বরফ পানিতে মুখ ডোবানোর উপকারিতা
- বরফ পানিতে মুখ ডোবানোর জনপ্রিয়তা
- ত্বকের ওপর বরফ পানির প্রভাব
- মুখের সতেজতা ও উজ্জ্বলতা
- চোখের ফোলাভাব কমানোর উপায়
- ঘুমঘুম ভাব দূর করার উপকারিতা
- বরফ পানিতে মুখ ডোবানোর সঠিক নিয়ম
- যাদের জন্য এই অভ্যাস উপযুক্ত নয়
- সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
- শেষ কথাঃ লেখকের মন্তব্য
সকালে বরফ পানিতে মুখ ডোবানোর উপকারিতা
সকালে বরফ পানিতে মুখ ডোবানোর উপকারিতা নিয়ে আজকে একটু গল্প করি। ঘটনাটা
এমন-আপনি ঘুম থেকে উঠলেন, চোখ তখনও পুরোপুরি খোলেনি, শরীরটা কেমন যেন ভারী ভারী
লাগছে। ঠিক এই মুহূর্তে যদি এক বাটি বরফ ঠান্ডা পানিতে মুখটা ডুবিয়ে দেন, দেখবেন
এক সেকেন্ডের মধ্যেই পুরো শরীরে একটা ঝাঁকুনি লাগে। এই ছোট্ট অভ্যাসটাই আজকাল
সোশ্যাল মিডিয়ায় "কোল্ড ফেস প্লাঞ্জ" নামে বেশ আলোচিত।
- শরীর জেগে ওঠে চোখের পলকেঃ আপনি হয়তো কফির উপর ভরসা করেন সকালে জাগতে। কিন্তু বরফ পানি তার চেয়ে দ্রুত কাজ করে। ঠান্ডা পানির সংস্পর্শে আসার সাথে সাথে শরীরে একটা রিফ্লেক্স অ্যাকশন কাজ করে, যাকে বলে "ডাইভ রিফ্লেক্স"। হৃদস্পন্দন সাথে সাথে কমে যায়, রক্তনালীগুলো সংকুচিত হয়। ফলে ঘুম ঘুম ভাবটা নিমিষেই কেটে যায়।
- মানসিক চাপ কমাতে দারুণ কার্যকরঃ আজকালকার ব্যস্ত জীবনে দুশ্চিন্তা লেগেই থাকে, তাই না? বরফ পানিতে মুখ ডোবানোর সময় শরীরের ভ্যাগাস নার্ভ সক্রিয় হয়ে ওঠে। এটাই মূলত আপনার নার্ভাস সিস্টেমকে শান্ত করার কাজটা করে। অনেকেই বলেন, এক মিনিটের এই অভ্যাসের পর মাথাটা হালকা লাগে, মনে হয় যেন নতুন করে দিন শুরু করছেন।
- ত্বকের জন্যও একটা উপহারঃ গরম পানি দিয়ে মুখ ধোয়ার অভ্যাস আছে অনেকেরই, কিন্তু এতে ত্বকের রোমকূপ খুলে যায়। বরফ পানি ঠিক তার উল্টো কাজটা করে-রোমকূপ শক্ত করে দেয়, ত্বক টানটান রাখে। সকালে মুখটা একটু ফোলা ফোলা লাগলে এই কৌশলে সেটাও কমে আসে চোখের পলকে।
- মনোযোগ ও একাগ্রতা বাড়েঃ অফিসে ঢোকার আগে যদি মাথাটা এলোমেলো লাগে, একটু বরফ পানিতে মুখ ডুবিয়ে দেখুন। শরীরে হঠাৎ যে সজাগতা তৈরি হয়, সেটা মস্তিষ্ককেও সতেজ করে তোলে। ফোকাস বাড়ে, কাজে মন বসাতে সুবিধা হয়-অনেকটা যেন মস্তিষ্কের রিসেট বাটন চাপার মতো ব্যাপার।
- তবে একটু সাবধানতা দরকারঃ হার্টের সমস্যা থাকলে বা রক্তচাপজনিত কোনো অসুবিধা থাকলে এই অভ্যাস শুরু করার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়াই ভালো। শরীর সবার একরকম নয়, তাই নিজের সীমাটা বুঝে এগোনো জরুরি। প্রথম দিকে বেশি ঠান্ডা পানি এড়িয়ে হালকা ঠান্ডা দিয়ে শুরু করতে পারেন।
শেষ কথা বলতে গেলে, এই ছোট্ট অভ্যাসটা আপনার সকালটাকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে।
খরচ নেই, সময়ও লাগে মাত্র এক মিনিট-অথচ ফল পাবেন সারাদিন ধরে। কালকে সকালে একবার
ট্রাই করে দেখুন তো, শরীর কী বলে!
বরফ পানিতে মুখ ডোবানোর জনপ্রিয়তা
আজকাল সোশ্যাল মিডিয়া খুললেই দেখবেন, অনেকেই সকালবেলা মুখে বরফ পানি ছিটিয়ে
ভিডিও বানাচ্ছেন। ব্যাপারটা যতটা না ট্রেন্ড, তার চেয়ে বেশি একটা লাইফস্টাইল
হয়ে উঠেছে বিশ্বজুড়ে। বিদেশি সেলিব্রিটি থেকে শুরু করে আমাদের দেশের ফিটনেস
ইনফ্লুয়েন্সাররাও এখন এই অভ্যাসের কথা প্রায়ই বলছেন। "আইস ফেসিয়াল" নামে
পরিচিত এই পদ্ধতিটা এখন রীতিমতো একটা কালচারে পরিণত হয়েছে। কোরিয়ান স্কিনকেয়ার
রুটিন যখন সারা পৃথিবীতে জনপ্রিয় হতে শুরু করল, তখন থেকেই বরফ পানির এই
অভ্যাসটাও আলোচনায় আসে। কোরিয়ান মেয়েরা বহু বছর ধরে এই পদ্ধতি ব্যবহার করছেন
তাদের গ্লাসি স্কিন পাওয়ার জন্য।
এরপর ধীরে ধীরে পশ্চিমা বিউটি ইন্ডাস্ট্রিও এটাকে নিজেদের রুটিনে জায়গা দিতে
শুরু করে। আপনি যদি ইউটিউবে "cold water face dip" লিখে সার্চ দেন, হাজার হাজার
ভিডিও পাবেন। মানুষজন নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন, আগে-পরের ছবি দিচ্ছেন,
রীতিমতো চ্যালেঞ্জ বানিয়ে ফেলেছেন এই নিয়ে। সকালে বরফ পানিতে মুখ ডোবানোর
উপকারিতা নিয়ে মানুষের এই আগ্রহটা আসলে হুট করে তৈরি হয়নি, বছরের পর বছর ধরে
ধীরে ধীরে এটা মানুষের বিশ্বাস অর্জন করেছে। এখনকার ব্যস্ত জীবনে মানুষ এমন কিছু
চায় যা কম সময়ে, কম খরচে ফলাফল দেয়। বরফ পানি তো ঘরেই থাকে, খরচও নেই বললেই
চলে। এই সহজলভ্যতাই মূলত এই অভ্যাসটাকে এত দ্রুত মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছে।
জিম ট্রেইনার থেকে শুরু করে ডার্মাটোলজিস্টরাও এখন এই পদ্ধতির পক্ষে কথা বলছেন।
বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা আর বাস্তব অভিজ্ঞতা-দুটোই একসাথে মিলে যাওয়ায় মানুষের
আস্থা আরও বেড়ে গেছে। যে জিনিসটা একসময় শুধু অ্যাথলেটদের রিকভারি টেকনিক হিসেবে
পরিচিত ছিল, সেটাই এখন সাধারণ মানুষের সকালের রুটিনের অংশ হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই ট্রেন্ডটা কোনো নির্দিষ্ট বয়স বা শ্রেণির মধ্যে
সীমাবদ্ধ নেই। কিশোরী থেকে শুরু করে পঞ্চাশোর্ধ্ব মানুষও এই অভ্যাস চর্চা করছেন
নিজেদের মতো করে। হয়তো এটাই প্রমাণ করে, ছোট আর সহজ জিনিসগুলোই শেষ পর্যন্ত
মানুষের মন জয় করে নেয়।
ত্বকের ওপর বরফ পানির প্রভাব
ত্বকের ব্যাপারে আমরা সবাই একটু বেশিই সচেতন, তাই না? বরফ পানি যখন আপনার মুখে
লাগে, প্রথমেই যে জিনিসটা ঘটে তা হলো রক্তনালীগুলো হঠাৎ সংকুচিত হয়ে যায়। এই
প্রক্রিয়াটাকে বলে ভাসোকনস্ট্রিকশন। শুনতে জটিল লাগলেও কাজটা আসলে খুব
সহজ-ত্বকের নিচের ফোলাভাব আর লালচে ভাব নিমিষেই কমে আসে। আপনার লোমকূপগুলো নিয়ে
একটু ভাবুন তো। গরম পানি বা বাষ্প যেমন লোমকূপ খুলে দেয়, ঠান্ডা পানি ঠিক তার
উল্টো কাজ করে। লোমকূপগুলো শক্ত হয়ে বন্ধ হয়ে আসে, ফলে ধুলাবালি আর তেল সহজে
ভেতরে ঢুকতে পারে না। এই কারণেই যাদের ব্রণের সমস্যা আছে, তারা এই অভ্যাসে বিশেষ
উপকার পান।
ত্বকের উজ্জ্বলতার পেছনেও এই ঠান্ডা পানির অবদান কম নয়। রক্ত সঞ্চালন বেড়ে
যাওয়ায় ত্বকের কোষগুলো বেশি অক্সিজেন আর পুষ্টি পায়। ফলাফল হিসেবে মুখে একটা
প্রাকৃতিক দীপ্তি ফুটে ওঠে, যেটা কোনো ক্রিম বা মেকআপ দিয়ে সহজে আনা যায় না।
বয়সের ছাপ নিয়ে চিন্তিত হলে এই অভ্যাসটা আপনার জন্য আরও বেশি কাজে দেবে। ঠান্ডা
পানি ত্বকের কোলাজেন উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে বলে মনে করা হয়, যা ত্বককে
টানটান রাখতে সাহায্য করে। নিয়মিত এই অভ্যাস চালিয়ে গেলে সূক্ষ্ম রেখা আর
বলিরেখা কিছুটা হলেও ধীরে গঠন হয়। তবে সব ত্বকের জন্য এটা সমানভাবে উপযোগী নয়,
এই কথাটা স্বীকার করতেই হবে।
যাদের ত্বক অতিরিক্ত সংবেদনশীল বা রোজেসিয়ার মতো সমস্যা আছে, তাদের জন্য হঠাৎ এই
ঠান্ডার ধাক্কা কিছুটা কঠোর হয়ে যেতে পারে। প্রথমবার চেষ্টা করার আগে হালকা
ঠান্ডা পানি দিয়ে শুরু করাই বুদ্ধিমানের কাজ। শেষমেশ বলতে গেলে, আপনার ত্বক
আপনাকেই সবচেয়ে ভালো বলে দেবে এই অভ্যাস তার সাথে যাচ্ছে কিনা। কয়েকদিন চেষ্টা
করে দেখুন, আয়নায় নিজের প্রতিফলনটাই আপনাকে উত্তর দিয়ে দেবে। ত্বকের যত্ন আসলে
ধৈর্যের খেলা-একদিনে কিছু বদলায় না, কিন্তু ধারাবাহিকতা ঠিকই ফল দেয়।
মুখের সতেজতা ও উজ্জ্বলতা
সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখটা দেখে অনেক সময় মনে হয়, রাতের ঘুমটা
যেন কোনো কাজেই আসেনি। চোখের নিচে কালচে ছাপ, ত্বকটা কেমন যেন নিস্তেজ আর
প্রাণহীন লাগে। এই সমস্যার সবচেয়ে সহজ আর দ্রুত সমাধান লুকিয়ে আছে একদম আপনার
হাতের নাগালেই। সকালে বরফ পানিতে মুখ ডোবানোর উপকারিতা এখানেই সবচেয়ে বেশি চোখে
পড়ে, কারণ কয়েক সেকেন্ডেই মুখের সেই নিস্তেজ ভাবটা কেটে যায়। মুখে সতেজতা আনার
জন্য মানুষ কত কিছুই না করে। দামি সিরাম, ফেসিয়াল, স্পা ট্রিটমেন্ট-তালিকার শেষ
নেই। অথচ একদম সাধারণ একটা বাটি বরফ পানি এই সবগুলোর চেয়ে দ্রুত ফলাফল দিতে
পারে, তাও আবার একদম বিনামূল্যে।
আরো পড়ুনঃ ঘুমের সমস্যা সমাধানের লাইফস্টাইল হ্যাকস
উজ্জ্বলতার কথা যদি বলি, তাহলে বুঝতে হবে ত্বকের নিচের রক্ত সঞ্চালনটাই আসল
খেলোয়াড়। ঠান্ডা পানির ঝাঁকুনি রক্তনালীগুলোকে সক্রিয় করে তোলে, ফলে মুখে একটা
স্বাভাবিক গোলাপি আভা ফুটে ওঠে। মেকআপ ছাড়াই এই গ্লো পাওয়াটা অনেকের কাছে
স্বপ্নের মতো মনে হতে পারে, কিন্তু এটা বাস্তবেই সম্ভব। চোখের ফোলাভাব নিয়ে যারা
প্রতিদিন লড়াই করেন, তাদের জন্য এই অভ্যাসটা রীতিমতো আশীর্বাদের মতো। রাত জাগা
বা কান্নাকাটির পর চোখের চারপাশে যে ফোলাভাব আসে, বরফ পানি সেটা মিনিটের মধ্যেই
কমিয়ে দেয়। অনেকে তো অফিসে যাওয়ার আগে এই ট্রিকটা ব্যবহার করে চোখের ক্লান্তি
লুকিয়ে ফেলেন।
সারাদিন মুখটা তরতাজা রাখতে চাইলে সকালের এই কয়েক সেকেন্ডই যথেষ্ট। ত্বক টানটান
থাকে, মেকআপও অনেক বেশি স্মুথভাবে বসে যায়। যারা সারাদিন বাইরে কাজ করেন, তাদের
জন্য এই সতেজতাটা দিনের শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে সাহায্য করে। এজন্য, মুখের সতেজতা
আর উজ্জ্বলতা পেতে বড় বড় পণ্যের পেছনে না ছুটে ছোট্ট এই অভ্যাসটা একবার আপনার
রুটিনে যোগ করে দেখুন। ফলাফল নিজের চোখেই দেখতে পাবেন, আর হয়তো এরপর থেকে সকালটা
শুরু হবে একটু অন্যভাবে, একটু বেশি জীবন্ত হয়ে।
চোখের ফোলাভাব কমানোর উপায়
চোখের ফোলাভাব নিয়ে সকালে ঘুম থেকে উঠে বিরক্ত হননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া
কঠিন। বিশেষ করে যাদের রাতে ভালো ঘুম হয় না বা কান্নাকাটির পর সকাল শুরু হয়,
তাদের চোখের চারপাশটা যেন ফুলে থাকে সারাক্ষণ। এই সমস্যাটা শুধু দেখতেই খারাপ
লাগে না, সারাদিনের আত্মবিশ্বাসেও প্রভাব ফেলে। ভাগ্যিস, এর সমাধান খুব একটা কঠিন
নয়। সবচেয়ে সহজ আর কার্যকর উপায় হলো ঠান্ডা কিছু ব্যবহার করা। একটা পরিষ্কার
কাপড় বরফ পানিতে ভিজিয়ে চোখের ওপর কয়েক মিনিট রেখে দিন। রক্তনালীগুলো সংকুচিত
হয়ে যাওয়ায় ফোলাভাব দ্রুতই কমে আসে, আর চোখটাও অনেক বেশি সতেজ দেখায়।
ফ্রিজে রাখা চামচও এক্ষেত্রে দারুণ কাজ করে। দুটো চামচ কিছুক্ষণ ফ্রিজে রেখে দিন,
তারপর চোখের নিচে ফোলা জায়গায় হালকা করে চেপে ধরুন। অনেকেই এই পুরনো ট্রিকটা
এখনও ব্যবহার করেন, কারণ এটা সত্যিই ফল দেয়। শসার টুকরোর কথা তো সবাই জানেন,
কিন্তু এর পেছনের কারণটা অনেকেই জানেন না। শসায় পানির পরিমাণ বেশি থাকে আর এটা
ঠান্ডাও থাকে স্বাভাবিকভাবে, তাই চোখের ওপর রাখলে ফোলাভাব আর ক্লান্তি দুটোই কমে।
দুই টুকরো শসা কেটে চোখের ওপর দশ মিনিট রেখে দিলেই যথেষ্ট। ঘুমের ভঙ্গিটাও এখানে
একটা বড় ভূমিকা রাখে, যদিও অনেকেই এই বিষয়টা এড়িয়ে যান।
উপুড় হয়ে ঘুমালে শরীরের তরল মুখের দিকে জমা হয়, ফলে সকালে ফোলাভাব বেশি দেখা
যায়। মাথার নিচে একটু উঁচু বালিশ ব্যবহার করলে এই সমস্যাটা অনেকটাই কমে যায়।
পানি কম খাওয়া বা লবণাক্ত খাবার বেশি খাওয়াও ফোলাভাবের একটা বড় কারণ। শরীরে
পানি জমে থাকলে সেটা চোখের চারপাশেও প্রভাব ফেলে, তাই দিনে পর্যাপ্ত পানি
খাওয়াটা ভুলে গেলে চলবে না। রাতে ঘুমানোর আগে অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার এড়িয়ে
চললে সকালটা অনেক সতেজ লাগবে।
এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলো একসাথে মিলিয়ে দেখুন, চোখের ফোলাভাব ধীরে ধীরে কমতে শুরু
করবে। রাতারাতি জাদুর মতো পরিবর্তন আশা না করে ধৈর্য ধরে চেষ্টা চালিয়ে যান।
শরীর সবসময় সময় নেয় সাড়া দিতে, কিন্তু নিয়মিত যত্ন নিলে ফলাফল ঠিকই আসবে।
ঘুমঘুম ভাব দূর করার উপকারিতা
সকালে ঘুম ভাঙার পরও চোখ যেন খুলতেই চায় না, শরীরটা কেমন ভারী ভারী লাগে। এই
ঘুমঘুম ভাবটা কাটাতে অনেকেই সরাসরি কফির মগে হাত বাড়ান। কিন্তু আপনি যদি এক
মুহূর্তের জন্য বরফ ঠান্ডা পানিতে মুখটা ডুবিয়ে দেন, ফলাফলটা রীতিমতো চমকে
দেওয়ার মতো। ঠান্ডা পানির এই হঠাৎ ঝাঁকুনি আপনার স্নায়ুতন্ত্রকে সজাগ করে তোলে
সঙ্গে সঙ্গেই। মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বেড়ে যায়, ফলে মাথাটাও অনেক বেশি পরিষ্কার
লাগে। যারা সকালে কাজে বসতে গিয়ে ঝিমুনি ভাব অনুভব করেন, তাদের জন্য এই ছোট্ট
কাজটা সত্যিকারের গেম চেঞ্জার হতে পারে। ঘুমঘুম ভাব কাটিয়ে ওঠার এই উপায়টা
শরীরের ওপর কোনো বাড়তি চাপও ফেলে না।
কফি বা এনার্জি ড্রিংকের মতো এখানে ক্যাফেইনের কোনো ঝামেলা নেই, পরে গিয়ে
ক্র্যাশ করার ভয়ও নেই। শুধু কয়েক সেকেন্ডের একটা কাজ, আর সারাদিনের শুরুটা হয়ে
যায় একদম ঝরঝরে। মানসিকভাবেও এর প্রভাব কম নয়। ঘুম জড়ানো চোখে দিন শুরু করলে
মেজাজটাও কেমন যেন গুমোট থাকে। কিন্তু এই ঠান্ডা পানির ঝটকা মনটাকেও এক ধরনের
ঝরঝরে অনুভূতি এনে দেয়, দিনের শুরুটা তাই হয়ে ওঠে অনেক বেশি ইতিবাচক। নিয়মিত
এই অভ্যাস চালিয়ে গেলে শরীরও ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যায় দ্রুত জেগে ওঠার সাথে।
সকালের এই সামান্য কষ্টটা মেনে নিলে বাকি দিনটা অনেক বেশি এনার্জেটিক আর ফোকাসড
কাটে। ছোট্ট একটা অভ্যাসই আসলে সারাদিনের মুড ঠিক করে দিতে পারে।
বরফ পানিতে মুখ ডোবানোর সঠিক নিয়ম
অনেকেই ভাবেন, একটা বাটিতে বরফ পানি নিয়ে মুখটা ডুবিয়ে দিলেই বুঝি কাজ শেষ।
কিন্তু সঠিক নিয়ম না জানলে সকালে বরফ পানিতে মুখ ডোবানোর উপকারিতা পুরোপুরি
পাওয়া যায় না, বরং ত্বকের ক্ষতি হয়ে যাওয়ারও একটা সম্ভাবনা থেকে যায়। তাই
শুরুতেই কয়েকটা জিনিস মাথায় রাখা জরুরি। প্রথমেই মুখটা ভালো করে পরিষ্কার করে
নিন কোনো মাইল্ড ক্লিনজার দিয়ে। ধুলাবালি বা মেকআপের অবশিষ্টাংশ মুখে থাকলে
ঠান্ডা পানির উপকারিতা ঠিকমতো কাজ করে না। পরিষ্কার ত্বকেই বরফ পানির প্রভাব
সবচেয়ে ভালোভাবে পৌঁছায়। একটা বড় বাটিতে বরফ কুচি আর সাধারণ পানি মিশিয়ে নিন,
একদম বরফ শীতল অবস্থায় নয় বরং একটু সহনীয় ঠান্ডায়।
পানির তাপমাত্রা এমন হওয়া উচিত যেন মুখে দিলে শরীর অস্বস্তিতে না কেঁপে ওঠে।
প্রথমবার চেষ্টা করলে হালকা ঠান্ডা পানি দিয়েই শুরু করা ভালো। এবার শ্বাস বন্ধ
করে মুখটা পানিতে ডুবিয়ে দিন দশ থেকে পনেরো সেকেন্ডের জন্য। এর বেশি সময় ধরে
রাখার দরকার নেই, কারণ অতিরিক্ত ঠান্ডায় ত্বকের রক্তনালী বেশি সংকুচিত হয়ে
গিয়ে উল্টো প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। চাইলে এই প্রক্রিয়াটা দুই থেকে তিনবার
পুনরাবৃত্তি করতে পারেন। মুখ তোলার পর পানি মুছে ফেলবেন না ঘষে ঘষে, বরং নরম
তোয়ালে দিয়ে হালকা করে চেপে চেপে শুকিয়ে নিন। এরপর একটা ভালো ময়েশ্চারাইজার
লাগিয়ে নিলে ত্বক আরও বেশি কোমল আর সতেজ থাকে।
এই ছোট্ট ধাপটা অনেকেই ভুলে যান, অথচ এটাই আসল ফলাফল ধরে রাখে। যাদের হার্টের
সমস্যা আছে বা ঠান্ডায় ত্বক সংবেদনশীল হয়ে যায়, তাদের এই পদ্ধতি শুরু করার আগে
ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। নিয়ম মেনে করলে এই সহজ অভ্যাসটাই আপনার সকালকে
বদলে দিতে পারে পুরোপুরি। শুধু ধৈর্য ধরে নিয়মিত চালিয়ে যান, ফলাফল নিজেই কথা
বলবে।
যাদের জন্য এই অভ্যাস উপযুক্ত নয়
সকালে বরফ পানিতে মুখ ডোবানোর উপকারিতা নিয়ে যতই কথা বলি না কেন, এটা কিন্তু
সবার জন্য সমানভাবে নিরাপদ নয়। কিছু মানুষের শরীর আর ত্বকের গঠন এমন যে এই
ঠান্ডার ধাক্কাটা উপকারের বদলে বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাই নিজের অবস্থাটা না বুঝে
হুট করে এই অভ্যাস শুরু করাটা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। হার্টের কোনো সমস্যা
থাকলে এই তালিকার একদম প্রথমে আপনার নাম চলে আসে। হঠাৎ ঠান্ডা পানির সংস্পর্শে
এলে হার্ট রেট হঠাৎ কমে যেতে পারে, যাকে বলে "ডাইভ রিফ্লেক্স"। যাদের আগে থেকেই
হার্টের অনিয়ম বা রক্তচাপের সমস্যা আছে, তাদের জন্য এই রিফ্লেক্সটা মারাত্মক
ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আরো পড়ুনঃ মাসিকের সময় অতিরিক্ত দুর্বল লাগলে করণীয়
রোজেসিয়া বা অতিরিক্ত সংবেদনশীল ত্বকের অধিকারীদের জন্যও এই অভ্যাসটা
ঝুঁকিপূর্ণ। ঠান্ডার হঠাৎ ধাক্কায় ত্বক লালচে হয়ে যাওয়া, জ্বালাপোড়া বা
র্যাশ ওঠার সম্ভাবনা থাকে। এমন ত্বক নিয়ে যারা এমনিতেই লড়াই করেন, তাদের জন্য
এটা উপকারের বদলে সমস্যা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। সাইনাসের সমস্যা বা মাইগ্রেনে
যারা নিয়মিত ভোগেন, তাদের জন্যও একটু সাবধান থাকা দরকার। হঠাৎ ঠান্ডার সংস্পর্শে
মাথাব্যথা বেড়ে যাওয়া বা সাইনাসের চাপ বেশি অনুভব হওয়ার ঘটনা অনেকের ক্ষেত্রেই
দেখা যায়। এমন হলে এই অভ্যাসটা এড়িয়ে চলাই ভালো, বা অন্তত হালকা ঠান্ডা পানি
দিয়ে শুরু করা উচিত।
গর্ভবতী নারী এবং যাদের সম্প্রতি কোনো ফেসিয়াল সার্জারি হয়েছে, তাদেরও এই
অভ্যাস থেকে দূরে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ। শরীরের এই অবস্থাগুলোতে হঠাৎ তাপমাত্রার
পরিবর্তন নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কোনো সন্দেহ থাকলে সবসময় নিজের ডাক্তারের
সাথে কথা বলে নেওয়াই শ্রেয়। নিজের শরীরের সীমাবদ্ধতা বোঝাটাই সবচেয়ে জরুরি। এই
তালিকায় নিজেকে খুঁজে পেলে হতাশ হওয়ার কিছু নেই, ত্বক আর শরীরের যত্নে আরও অনেক
উপায় খোলা আছে। সবার জন্য সব কিছু নয়, আর সেটা মেনে নেওয়াটাই আসল বুদ্ধিমত্তা।
সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
বরফ পানিতে মুখ ডোবানোর অনেক উপকারিতা থাকলেও, সব ভালো জিনিসের মতো এরও কিছু
নেতিবাচক দিক আছে। বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো সাময়িক
আর তেমন গুরুতর নয়। তবে আগে থেকে জেনে রাখলে আপনি অনেক বেশি সতর্কভাবে অভ্যাসটা
শুরু করতে পারবেন। প্রথমেই বলি ত্বকের লালচে ভাবের কথা। ঠান্ডা পানির সংস্পর্শে
আসার পর অনেকের মুখ কিছুক্ষণের জন্য লাল হয়ে যায়, সাথে হালকা জ্বালাপোড়াও
অনুভব হতে পারে। এটা সাধারণত কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঠিক হয়ে যায়, তবে ত্বক
সংবেদনশীল হলে এই সময়টা একটু বেশি লাগতে পারে। মাথা ঘোরা বা হালকা অস্বস্তির
অভিজ্ঞতাও কিছু মানুষের হতে পারে।
ঠান্ডা পানির হঠাৎ ধাক্কায় শরীরের স্নায়ুতন্ত্র কিছুটা চমকে যায়, ফলে
মুহূর্তের জন্য মাথাটা হালকা ঝিমঝিম করতে পারে। বসে থেকে এই কাজটা করলে এই সমস্যা
এড়ানো সহজ হয়। ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে যাওয়ার অভিযোগও কিছু মানুষের কাছ থেকে
শোনা যায়। বারবার ঠান্ডা পানির সংস্পর্শে ত্বকের প্রাকৃতিক তেল কিছুটা কমে যেতে
পারে, বিশেষ করে যাদের ত্বক এমনিতেই শুষ্ক তাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা বেশি চোখে
পড়ে। এই কারণেই মুখ তোলার পর ময়েশ্চারাইজার লাগানোর কথা বারবার বলা হয়। খুব কম
ক্ষেত্রে সাইনাসের চাপ বেড়ে যাওয়া বা মাথাব্যথার অভিজ্ঞতাও দেখা যায়।
যাদের আগে থেকেই সাইনাসের সমস্যা আছে, ঠান্ডার হঠাৎ ধাক্কা তাদের জন্য কিছুটা
অস্বস্তিকর হতে পারে। এমন হলে পানির তাপমাত্রা একটু বাড়িয়ে হালকা ঠান্ডায় শুরু
করাই ভালো। এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো দেখে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, বরং এগুলো
জেনে রাখলে আপনি নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়া বুঝে সেভাবেই এগোতে পারবেন। শরীর
প্রথমে একটু সময় নেয় মানিয়ে নিতে, তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে আসে।
নিজের শরীরের ইঙ্গিতগুলো খেয়াল রাখাটাই সবচেয়ে বড় সাবধানতা।
শেষ কথাঃ লেখকের মন্তব্য
সত্যি বলতে, এই লেখাটা লিখতে গিয়ে নিজের সকালের রুটিনটাও একটু নতুন করে ভাবতে
বসে গেলাম। ছোট ছোট অভ্যাসগুলোকে আমরা প্রায়ই অবহেলা করি, অথচ এগুলোই মাঝে মাঝে
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এনে দেয়। বরফ পানিতে মুখ ডোবানোর ব্যাপারটাও ঠিক তেমনই
একটা জিনিস-দেখতে সাধারণ, কিন্তু প্রভাবটা মোটেও সাধারণ নয়। আমি নিজেও যখন প্রথম
এই অভ্যাসটা শুরু করি, প্রথম দুই-তিন দিন বেশ কষ্টই লেগেছিল। ঠান্ডা পানিটা মুখে
লাগার সাথে সাথে মনে হতো, ধুর কী দরকার এসবের। কিন্তু এক সপ্তাহ পার হতেই
পার্থক্যটা নিজেই টের পেয়েছিলাম, মুখটা যেন আগের চেয়ে অনেক বেশি জীবন্ত লাগছিল।
আপনি যদি এখনো ভাবছেন এটা করবেন কিনা, আমার পরামর্শ হলো একবার অন্তত চেষ্টা করে
দেখুন। শরীর আর মন দুটোই আপনাকে জানিয়ে দেবে এই অভ্যাসটা আপনার সাথে যায় কি না।
জোর করে কিছু চালিয়ে যাওয়ার দরকার নেই, নিজের শরীরের কথা শোনাটাই আসল। সৌন্দর্য
বা সতেজতার পেছনে ছোটার এই দৌড়ে আমরা প্রায়ই দামি প্রোডাক্টের দিকে ছুটি, অথচ
প্রকৃতির এত সহজলভ্য একটা জিনিস আমাদের হাতের কাছেই পড়ে থাকে। এই লেখাটা যদি
আপনার সকালটাকে একটু হলেও বদলে দিতে সাহায্য করে, তাহলেই আমার লেখার উদ্দেশ্য
সার্থক। শেষমেশ, নিজের যত্ন নেওয়ার এই ছোট্ট চেষ্টাগুলোই একদিন বড় কিছুতে রূপ
নেয়।




ইনফোনেস্টইনের শর্তাবলী মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট পর্যাবেক্ষন করা হয়।
comment url