গর্ভাবস্থায় পেটে গ্যাস হলে করণীয় কি ও সমাধান
গর্ভাবস্থায় পেটে গ্যাস হলে করণীয় কি ও সমাধান জানতে চাইছেন? আপনি একা নন-এই সমস্যায় অনেক হবু মা-ই অস্বস্তিতে ভোগেন। কখন এটি স্বাভাবিক, আর কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি-সহজ ভাষায় সব ব্যাখ্যা করা হয়েছে। খাবার ও ঘরোয়া উপায়ে অস্বস্তি কমান
অযথা ভয় না পেয়ে নিজের ও গর্ভের শিশুর সুস্থতার জন্য কোন বিষয়গুলো আগে গুরুত্ব
দেবেন, সেটিও তুলে ধরা হয়েছে। অনলাইনে ছড়িয়ে থাকা বিভ্রান্তিকর তথ্য নয়, সহজে
বোঝার মতো কার্যকর নির্দেশনাই এখানে রয়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য এক জায়গায়, সিদ্ধান্ত সহজ।
পোস্ট সূচিপত্রঃ গর্ভাবস্থায় পেটে গ্যাস হলে করণীয় কি ও সমাধান
- গর্ভাবস্থায় পেটে গ্যাস হলে করণীয় কি ও সমাধান
- গর্ভাবস্থায় পেটে গ্যাস কেন হয়?
- গর্ভবতী মায়ের গ্যাসের সাধারণ লক্ষণ
- গর্ভাবস্থায় গ্যাস কমাতে কোন খাবার খাওয়া উচিত?
- যেসব খাবার খেলে গ্যাস আরও বেড়ে যেতে পারে
- গর্ভাবস্থায় গ্যাস কমানোর সহজ ঘরোয়া উপায়
- গর্ভাবস্থায় পেটে গ্যাস হলে কী কী কাজ এড়িয়ে চলবেন?
- গ্যাস কমাতে হাঁটা, পানি পান ও দৈনন্দিন অভ্যাসের ভূমিকা
- গ্যাস ভেবে দেরি না করে কখন ডাক্তার দেখাবেন?
- শেষ কথাঃ লেখকের মন্তব্য
গর্ভাবস্থায় পেটে গ্যাস হলে করণীয় কি ও সমাধান
গর্ভাবস্থায় পেটে গ্যাস হলে করণীয় কি ও সমাধান-এটা শুধু একটা শারীরিক সমস্যা
নয়, এটা মানসিক চাপও। গর্ভবতী মায়েরা যখন এই সমস্যায় পড়েন, তখন ভাবনার শেষ
থাকে না। আপনি যদি এখনই এই পরিস্থিতিতে আছেন, তাহলে জানুন-এটা সম্পূর্ণ
স্বাভাবিক। গর্ভকালীন সময়ে হরমোনের পরিবর্তন আপনার পাচনতন্ত্রকে একটু আলস করে
দেয়। খাবার পেটে থাকে বেশি দিন, আর এই সময়টাতেই গ্যাস তৈরি হয়। আপনার বাড়ন্ত
জরায়ু পেটের চারপাশে চাপ দেয়, যা হজমপ্রক্রিয়াকে আরও মন্থর করে দেয়। এর ফলে
ফুলে গ্যাস জমে থাকে। এখন আসি সমাধানের কথায়। প্রথম জিনিসটা হলো খাওয়ার ধরন
পরিবর্তন করা।
আপনি একসাথে অনেক বেশি খাবার খাবেন না, বরং দিনে ৫-৬ বার কম পরিমাণে খান। এতে
আপনার পেট চাপমুক্ত থাকবে এবং হজমও ভালো হবে। ছোট খাবার মানে আপনার শরীর সহজেই
সেগুলো প্রক্রিয়া করতে পারে। পানি খান প্রচুর পরিমাণে। প্রতিদিন অন্তত ৮-১০
গ্লাস পানি খাওয়ার চেষ্টা করুন। পানি আপনার পাচনতন্ত্রকে গ্যাস দ্রুত বের করতে
সাহায্য করে। তবে খাবারের সময় পানি খাবেন না, আধঘণ্টা আগে বা পরে খান। আপনার
খাদ্যতালিকায় ফাইবার যোগ করুন, কিন্তু আস্তে আস্তে। হঠাৎ বেশি ফাইবার বাড়িয়ে
দিলে গ্যাসের সমস্যা আরও বাড়বে। সবজি, ফল এবং গোটা দানার খাবার ধীরে ধীরে খাদ্যে
অন্তর্ভুক্ত করুন। এতে আপনার পেট ধাপে ধাপে অভ্যস্ত হবে।
যে খাবারগুলো আপনার পেট ফাঁপায়, সেগুলো এড়িয়ে চলুন। ডাল, বাঁধাকপি, ব্রকলি,
রসুন, পেঁয়াজ-এই জিনিসগুলো গ্যাস বাড়ায়। কিন্তু এর মানে এই নয় যে আপনি
একেবারে খাবেন না। যখন আপনার পেট ভালো থাকবে, তখন কম পরিমাণে খেতে পারেন।
চিনিযুক্ত খাবার এবং তেলে ভাজা খাবার থেকে দূরে থাকুন। এই খাবারগুলো হজম করা
কঠিন, এবং গর্ভাবস্থায় আপনার শরীর এতটা শক্তি খরচ করতে পারে না। দোকানের প্যাকেট
খাবার এড়িয়ে চলাই ভালো। চা এবং কফি আপনার পেটের অ্যাসিড বাড়ায়। আপনি চাইলে
ক্যাফেইনমুক্ত চা বা হালকা দেশী চা খেতে পারেন। কিন্তু সাদা দুধের চা আপনার জন্য
সেরা।
একটু হাঁটাহাঁটি করুন প্রতিদিন। আপনার ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী মৃদু ব্যায়াম
বা হালকা যোগ করতে পারেন। হাঁটার সময় আপনার শরীর গ্যাস বের করতে স্বাভাবিকভাবেই
সাহায্য করে। এটা শুধু গ্যাস দূর করে না, আপনার মেজাজও ভালো করে। খাওয়ার পর
সবসময় দাঁড়িয়ে থাকুন বা ধীরে ধীরে হাঁটুন। অবিলম্বে শুয়ে পড়বেন না, কারণ এতে
খাবার সহজে নেমে আসে না। অন্তত ২০ মিনিট পরে শুতে যান। রাতে ঘুমানোর সময় বাম
পাশে শুয়ে থাকুন-এতে পেটের চাপ কম থাকে। যোগ এবং প্রাকৃতিক পদ্ধতি চেষ্টা করুন।
আদা, লেবু এবং পুদিনার চা গ্যাস কমাতে বেশ কার্যকর। কিন্তু এসব চা খাওয়ার আগে
আপনার ডাক্তারের কথা বলুন, কারণ কিছু জিনিস গর্ভাবস্থায় সমস্যা সৃষ্টি করতে
পারে।
পেটে তেল মালিশ করুন হালকা হাতে। এটা পেটের পেশীগুলোকে শিথিল করে এবং গ্যাসের চাপ
কমায়। গরম পানির ব্যাগ দিয়েও সেক দিতে পারেন, কিন্তু খুব বেশি গরম নয়। কুসুম
গরম পানি সবচেয়ে ভালো। নিজেকে স্ট্রেসমুক্ত রাখুন। মানসিক চাপ সরাসরি আপনার
পাচনতন্ত্রকে প্রভাবিত করে। ধ্যান করুন, গানবাজনা শুনুন, পরিবারের সাথে সময়
কাটান। মন প্রশান্ত থাকলে পেটের সমস্যাও অনেকটা কমে যায়। ওষুধ খাওয়ার আগে
অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিন। গর্ভাবস্থায় যেকোনো ওষুধ নিরাপদ নয়। আপনার
ডাক্তার যদি কোনো বিশেষ প্রোবায়োটিক্স বা হালকা পরিপাক ওষুধ সুপারিশ করেন, তাহলে
সেটাই নিন।
সিমেথিকোন জাতীয় ওষুধগুলো সাধারণত নিরাপদ, কিন্তু তাও নিশ্চিত করুন। সবচেয়ে
জরুরি কথা-ধৈর্য রাখুন নিজের সাথে। গর্ভাবস্থা একটা অস্থায়ী পর্যায়, এবং এই
সমস্যাও ধীরে ধীরে চলে যাবে। প্রসবের পর আপনার শরীর আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
তখন আপনার পাচনতন্ত্রও আগের মতো কাজ করতে শুরু করবে। আপনার শরীর যা বলছে তা
শুনুন। কোন খাবার আপনাকে ফুলিয়ে দেয়, সেটা চিহ্নিত করুন এবং এড়িয়ে চলুন।
প্রতিটি শরীর আলাদা, তাই সবার জন্য একই সমাধান কাজ করে না। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে
শিখুন এবং সেই অনুযায়ী আপনার জীবনযাত্রা সাজিয়ে নিন।
গর্ভাবস্থায় পেটে গ্যাস কেন হয়?
গর্ভাবস্থায় আপনার শরীরে অনেক কিছু পরিবর্তন হয়, আর পেটে গ্যাস সেই
পরিবর্তনের একটা স্বাভাবিক ফল। বেশিরভাগ গর্ভবতী মা এই সমস্যার সম্মুখীন হন,
এবং এটা কোনো বড় চিন্তার বিষয় নয়। আপনার শরীর সবকিছু ঠিকঠাক করছে, শুধু একটু
ভিন্নভাবে। প্রথম কারণটা হলো হরমোনের পরিবর্তন। গর্ভাবস্থায় আপনার শরীর বিশাল
মাত্রায় প্রোজেস্টেরন হরমোন তৈরি করে। এই হরমোন আপনার পেটের সব পেশীকে শিথিল
করে দেয়, যা জরায়ু সংকোচন প্রতিরোধ করার জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু এই শিথিলতা
আপনার পাচনতন্ত্রেও কাজ করে। যখন আপনার পাচনতন্ত্রের পেশীগুলো শিথিল হয়ে যায়,
তখন খাবার পেটে অনেক বেশি সময় থাকে।
এই সময়ে ব্যাকটেরিয়া খাবার ভেঙে ফেলে এবং গ্যাস তৈরি করে। এর ফলে আপনার পেট
ফুলে ওঠে এবং অস্বস্তি অনুভব করেন। গর্ভাবস্থায় পেটে গ্যাস হলে করণীয় কি ও
সমাধান জানা আপনার জীবনটা অনেক সহজ করে তুলবে। আপনার বাড়ন্ত জরায়ু আরেকটা
প্রধান কারণ। প্রতিদিন আপনার জরায়ু বড় হচ্ছে এবং পেটের ভেতরের সব জায়গা দখল
করছে। এই চাপের কারণে আপনার অন্ত্র একটু এদিক-ওদিক হয়ে যায় এবং গ্যাস বেরিয়ে
আসতে বেশি সময় লাগে। পেটে জমে থাকা গ্যাসই আসল সমস্যা। লোহা এবং ক্যালসিয়াম
সাপ্লিমেন্ট খাওয়া আপনার পরিপাকতন্ত্রকে আরও ধীর করে দেয়।
গর্ভাবস্থায় আপনাকে এসব সাপ্লিমেন্ট খেতে হয় বাচ্চার বিকাশের জন্য, কিন্তু
এগুলো কখনো কখনো কোষ্ঠকাঠিন্য এবং গ্যাসের কারণ হয়। আপনার ডাক্তার যদি বলেন এই
সাপ্লিমেন্টগুলো খাওয়া জরুরি, তাহলে আপনি আরও বেশি পানি খান এবং আরও বেশি
ফাইবার নিন। আপনার খাওয়ার গতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বেশিরভাগ মানুষ
দ্রুত খায়, এবং গর্ভাবস্থায় এটা আরও সমস্যা সৃষ্টি করে। যখন আপনি তাড়াতাড়ি
খান, তখন আপনার মুখ এবং পেটের মধ্যে বাতাস চলে যায়। এই বাতাসই পরে গ্যাসে
পরিণত হয়। স্ট্রেস এবং দুশ্চিন্তা আপনার পাচনতন্ত্রকে ধীর করে দেয়। যখন আপনি
উদ্বিগ্ন থাকেন, তখন আপনার শরীর হজমের চেয়ে অন্য জিনিসে মনোযোগ দেয়।
এর ফলে খাবার যথাযথভাবে হজম হয় না এবং গ্যাস তৈরি হয়। গর্ভাবস্থায় আপনার মন
অনেক উত্থান-পতন অনুভব করে, এবং এটা পেটের সমস্যা বাড়ায়। কিছু কিছু খাবার
স্বাভাবিকভাবেই গ্যাস তৈরি করে, এবং গর্ভাবস্থায় এই সমস্যা আরও বেশি হয়। ডাল,
বাঁধাকপি, ব্রকলি, ফুলকপি এবং অন্যান্য ক্রুসিফেরাস সবজি আপনার পেটে গ্যাস
বাড়ায়। এছাড়াও উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবারও হজম করা কঠিন হয়ে যায়। কার্বোনেটেড
পানীয় এবং সোডা আপনার পেটে সরাসরি বুদ্বুদ পাঠায়। আপনি যখন এই পানীয়গুলো
পান, তখন আপনার পেট বুদ্বুদে পূর্ণ হয়ে যায়। এই বুদ্বুদগুলো বের হতে গেলে
আপনি বারবার ঢেকুর তুলবেন এবং পেটে অস্বস্তি অনুভব করবেন। এসব পানীয় এড়িয়ে
চলাই সেরা।
সবার শরীর আলাদা, তাই সবার জন্য একই জিনিস সমস্যার কারণ নয়। আপনাকে নিজের
শরীরকে বুঝতে হবে এবং দেখতে হবে কোন খাবার বা অভ্যাস আপনার পেটে সমস্যা সৃষ্টি
করে। কিছু মায়ের জন্য ডাল গ্যাস করে, আবার কিছু মায়ের জন্য ভাত বা আটা
সমস্যার কারণ। আপনার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শিখুন।
গর্ভবতী মায়ের গ্যাসের সাধারণ লক্ষণ
গর্ভাবস্থায় গ্যাসের লক্ষণ চেনা আসলে খুব একটা কঠিন কাজ না। আপনি যদি একটু
মনোযোগ দেন, তাহলে নিজের শরীরই আপনাকে জানিয়ে দেবে কখন কী হচ্ছে। চলুন দেখে নিই
কোন কোন লক্ষণগুলো আপনার সবচেয়ে বেশি চোখে পড়বে। পেট ফুলে যাওয়া সবচেয়ে
সাধারণ এবং প্রথম লক্ষণ। খাওয়ার পর হঠাৎ আপনার পেট টানটান হয়ে যায়, যেন ভেতরে
বেলুন ফোলানো হচ্ছে। অনেক সময় এই ফোলাভাব এতটাই বেড়ে যায় যে আপনার পোশাকও
আঁটসাঁট লাগতে শুরু করে। এটা অস্বস্তিকর হলেও একেবারে স্বাভাবিক ব্যাপার। বারবার
ঢেকুর ওঠা আরেকটা লক্ষণ, যা আপনি হয়তো আগে কখনো এত বেশি অনুভব করেননি।
খাওয়ার সময় বা খাওয়ার পরপরই এই ঢেকুর আসতে থাকে। কখনো কখনো এটা এমনভাবে আসে যে
আপনি বিব্রত বোধ করেন, বিশেষ করে মানুষের সামনে। তবে এটা আপনার শরীরের একটা
স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া মাত্র। পেটে ব্যথা বা মোচড় দেওয়া অনুভূতিও আপনার হতে
পারে। এই ব্যথা কখনো একপাশে থাকে, আবার কখনো পুরো পেট জুড়ে ছড়িয়ে যায়। অনেক
সময় এই ব্যথা এত তীব্র হয় যে আপনি ভয় পেয়ে যান, ভাবেন হয়তো অন্য কোনো
সমস্যা। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা শুধুই আটকে থাকা গ্যাসের কারণ। পায়ুপথ
দিয়ে বারবার গ্যাস নির্গত হওয়াও একটা লক্ষণ, যা নিয়ে আপনি হয়তো লজ্জা পান।
কিন্তু বিশ্বাস করুন, এটা প্রতিটা গর্ভবতী মায়ের সাথেই ঘটে।
শরীর ভেতরে জমে থাকা বাতাস বের করার চেষ্টা করছে, এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
বুকজ্বালা বা অ্যাসিডিটির অনুভূতি অনেক সময় গ্যাসের সাথে একসাথে আসে। খাওয়ার পর
বুকের মাঝখানে জ্বালাপোড়া করে, গলা পর্যন্ত টক ভাব উঠে আসে। এটা বিশেষ করে রাতে
শোয়ার সময় বেশি অনুভূত হয়। আপনার জরায়ু পেটের উপর চাপ দেওয়ায় এই সমস্যা আরও
বাড়ে। ক্ষুধামন্দাও একটা লক্ষণ হতে পারে, যা আপনি প্রথমে বুঝতেও পারবেন না। পেট
ভরা ভরা লাগে, যদিও আপনি তেমন কিছু খাননি। এর ফলে আপনার খাওয়ার ইচ্ছাও কমে যায়,
যেটা গর্ভাবস্থায় ঠিক নয়। শরীরে পর্যাপ্ত পুষ্টি পৌঁছাতে হলে এই সমস্যাটা
সমাধান করা জরুরি।
কোষ্ঠকাঠিন্যও গ্যাসের সাথে হাত ধরাধরি করে আসে প্রায়ই। আপনার মলত্যাগের
স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হয়, এবং এটা গ্যাসকে আরও বাড়িয়ে দেয়। যত বেশি খাবার
পেটে জমে থাকবে, তত বেশি গ্যাস তৈরি হবে। তাই এই দুটো সমস্যা একসাথে দেখা দিলে
অবাক হবেন না। ঘুমের সমস্যাও এই লক্ষণগুলোর একটা অংশ হতে পারে। রাতে শোয়ার পর
পেটের অস্বস্তির কারণে আপনার ঘুম বারবার ভেঙে যায়। পাশ ফিরে শুতে গিয়েও আরাম
পান না, কারণ পেটের চাপ একদিক থেকে অন্যদিকে সরে যায়। এই অনিদ্রা আপনার
সারাদিনের মেজাজেও প্রভাব ফেলে। এই সব লক্ষণ একসাথে দেখা দিতে পারে, আবার আলাদা
আলাদাভাবেও আসতে পারে।
প্রতিটা গর্ভবতী মায়ের অভিজ্ঞতা আলাদা, তাই আপনার লক্ষণ অন্য কারো মতো নাও হতে
পারে। তবে একটা কথা মনে রাখবেন-এই লক্ষণগুলো বেশিরভাগ সময় নিরাপদ এবং সাময়িক।
যদি ব্যথা তীব্র হয় বা রক্তপাত হয়, তাহলে দেরি না করে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ
করুন।
গর্ভাবস্থায় গ্যাস কমাতে কোন খাবার খাওয়া উচিত?
গ্যাস কমাতে হলে আপনার প্লেটে কী থাকছে, সেটাই সবচেয়ে বড় কথা। সঠিক খাবার বেছে
নিলে আপনার পেট অনেকটাই স্বস্তি পাবে। চলুন দেখে নিই কোন খাবারগুলো আপনার জন্য
উপকারী। আদা আপনার সবচেয়ে ভালো বন্ধু হতে পারে এই সময়ে। এক টুকরো আদা চিবিয়ে
খেলে বা আদা চা পান করলে হজম দ্রুত হয়। এটা পেটের পেশীগুলোকে শিথিল করে গ্যাস
বের হতে সাহায্য করে। টক দই আপনার পাচনতন্ত্রের জন্য দারুণ কাজ করে। এতে থাকা
প্রোবায়োটিক্স আপনার অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়া বাড়ায়। প্রতিদিন এক বাটি দই
খেলে আপনার হজমশক্তি অনেকটাই উন্নত হবে। পাকা কলা এবং পেঁপে আপনার তালিকায় রাখুন
অবশ্যই।
এই ফলগুলো সহজে হজম হয় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য কমায়। পেঁপেতে থাকা এনজাইম আপনার পেট
ফাঁপা কমাতে বিশেষভাবে সাহায্য করে। শসা এবং তরমুজের মতো পানিযুক্ত সবজি-ফল খান
বেশি করে। এগুলো আপনার শরীরে পানির ঘাটতি পূরণ করে এবং হজম সহজ করে। গরমের দিনে
এই খাবারগুলো আপনাকে আরাম দেবে দ্বিগুণভাবে। জিরা এবং মৌরি আপনার রান্নাঘরেই আছে,
শুধু ব্যবহার করতে হবে ঠিকভাবে। খাওয়ার পর এক চিমটি ভাজা জিরা বা মৌরি চিবিয়ে
খান। এই মশলাগুলো প্রাকৃতিকভাবে গ্যাস কমাতে কাজ করে বহু বছর ধরে। ওটস এবং লাল
চালের ভাত আপনার হজমতন্ত্রকে সচল রাখে।
এগুলোতে থাকা ফাইবার ধীরে ধীরে হজম হয় এবং পেট ফাঁপা কমায়। সাদা ভাতের বদলে
মাঝে মাঝে এই বিকল্পগুলো বেছে নিতে পারেন। পুদিনা পাতা আপনার পেটের জন্য
প্রাকৃতিক ওষুধের মতো কাজ করে। পুদিনা চা বা পুদিনা পাতা দিয়ে বানানো শরবত খেলে
পেট ঠান্ডা থাকে। এটা গ্যাস এবং অ্যাসিডিটি দুটোই কমাতে সাহায্য করে। হালকা সেদ্ধ
সবজি আপনার জন্য কাঁচা সবজির চেয়ে ভালো বিকল্প। কাঁচা সবজি হজম করতে আপনার
শরীরকে বেশি পরিশ্রম করতে হয়।
তাই গাজর, লাউ, কুমড়ার মতো সবজি হালকা সেদ্ধ করে খান। এই খাবারগুলো নিয়মিত খেলে
আপনি নিজেই পার্থক্য বুঝতে পারবেন কয়েকদিনের মধ্যে। তবে মনে রাখবেন, প্রতিটা
শরীর আলাদাভাবে সাড়া দেয়। যেটা আপনার জন্য কাজ করছে, সেটাই আপনার আসল সমাধান।
যেসব খাবার খেলে গ্যাস আরও বেড়ে যেতে পারে
কিছু খাবার আছে যেগুলো আপনার পেটের গ্যাস আরও বাড়িয়ে দিতে পারে, তাই এগুলো চিনে
রাখা জরুরি। আপনি হয়তো না জেনেই প্রতিদিন এমন কিছু খাচ্ছেন যা সমস্যা বাড়াচ্ছে।
গর্ভাবস্থায় পেটে গ্যাস হলে করণীয় কি ও সমাধান জানার পাশাপাশি কোন খাবার এড়াতে
হবে সেটাও জানা সমান জরুরি। ডাল জাতীয় খাবার, বিশেষ করে ছোলা ও রাজমা, আপনার
পেটে প্রচুর গ্যাস তৈরি করে। এগুলোতে থাকা জটিল কার্বোহাইড্রেট হজম করতে আপনার
শরীরকে বেশি সময় নিতে হয়। তাই এই খাবারগুলো খেলে ভালোভাবে ভিজিয়ে ও রান্না করে
খান। বাঁধাকপি, ফুলকপি এবং ব্রকলির মতো সবজি স্বাস্থ্যকর হলেও গ্যাসের বড়
কারণ।
এই সবজিগুলোতে এমন উপাদান আছে যা অন্ত্রে ভেঙে গিয়ে গ্যাস তৈরি করে।
গর্ভাবস্থায় এই সবজি একদম বাদ না দিয়ে পরিমাণে কমিয়ে খান। পেঁয়াজ ও রসুন
আপনার রান্নার স্বাদ বাড়ালেও পেট ফাঁপার অন্যতম কারণ। কাঁচা পেঁয়াজ বিশেষভাবে
বেশি সমস্যা করে। রান্না করা পেঁয়াজ-রসুন কিছুটা কম ক্ষতিকর, তাই কাঁচা খাওয়া
এড়িয়ে চলুন। কার্বোনেটেড পানীয় এবং সোডা সরাসরি আপনার পেটে বুদ্বুদ পাঠায়। এই
পানীয়গুলো পান করার সাথে সাথে আপনার পেট ফুলে ওঠে। গর্ভাবস্থায় এসব পানীয় থেকে
সম্পূর্ণ দূরে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ। তেলে ভাজা এবং ফাস্টফুড জাতীয় খাবার হজম
করা আপনার শরীরের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
এই খাবারগুলোতে থাকা অতিরিক্ত চর্বি পাচনতন্ত্রকে ধীর করে দেয়। ফলে খাবার
বেশিক্ষণ পেটে থেকে গ্যাস তৈরি করে। দুগ্ধজাত খাবার কিছু মায়ের জন্য সমস্যা তৈরি
করতে পারে, বিশেষ করে যাদের ল্যাকটোজ সহ্য হয় না। দুধ, পনির বেশি খেলে পেট ফাঁপা
এবং গ্যাসের সমস্যা বেড়ে যায়। আপনি যদি এই ধরনের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করেন,
তাহলে দই বা টক দুধের বিকল্প বেছে নিন। চিনিযুক্ত এবং কৃত্রিম মিষ্টিযুক্ত খাবার
আপনার অন্ত্রে ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য নষ্ট করে। চুইংগাম বা সুগার-ফ্রি খাবারে
থাকা সরবিটল বিশেষভাবে গ্যাস বাড়ায়। এই ধরনের খাবার যতটা সম্ভব কম খান। গমজাত
খাবার বেশি খেলেও কিছু মায়ের পেটে গ্যাস বেড়ে যেতে পারে।
রুটি, পাউরুটি, পাস্তার মতো খাবারে থাকা গ্লুটেন কারো কারো জন্য সহজে হজম হয় না।
আপনার শরীর কেমন প্রতিক্রিয়া দেখায় সেটা লক্ষ্য রাখুন। এই খাবারগুলো একেবারে
বাদ দিতে হবে এমন নয়, শুধু পরিমাণে সচেতন থাকুন। প্রতিটা শরীরের প্রতিক্রিয়া
আলাদা, তাই নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝে নিন কোনটা আপনার জন্য ঠিক। খাবারের একটা
তালিকা রাখতে পারেন, কোনটা খেলে সমস্যা হয় সেটা মনে রাখার জন্য।
গর্ভাবস্থায় গ্যাস কমানোর সহজ ঘরোয়া উপায়
ঘরোয়া উপায়গুলো আসলে সবচেয়ে নিরাপদ, কারণ এখানে কোনো ওষুধের ঝুঁকি নেই। আপনার
হাতের কাছেই এমন অনেক সমাধান আছে, যা আপনি হয়তো খেয়ালই করেননি। চলুন দেখে নিই
সহজ কিছু ঘরোয়া পদ্ধতি। কুসুম গরম পানি দিয়ে দিন শুরু করুন প্রতিদিন সকালে।
খালি পেটে এক গ্লাস হালকা গরম পানি আপনার পাচনতন্ত্রকে সচল করে দেয়। এতে সারারাত
জমে থাকা গ্যাসও অনেকটা কমে যায়। আদা-লেবুর পানি আপনার জন্য দারুণ একটা সমাধান
হতে পারে। এক টুকরো আদা কুচি করে গরম পানিতে দিয়ে তাতে সামান্য লেবুর রস মিশিয়ে
খান। এই মিশ্রণ পেটের অস্বস্তি কমাতে খুব দ্রুত কাজ করে।
খাওয়ার পর হালকা হাঁটাহাঁটি করুন অন্তত ১০-১৫ মিনিট। এতে আপনার হজমপ্রক্রিয়া
সচল থাকে এবং গ্যাস আটকে থাকে না। শুয়ে পড়ার আগে এই ছোট্ট অভ্যাসটা আপনাকে অনেক
আরাম দেবে। পেটে হালকা হাতে মালিশ করুন ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘুরিয়ে। সরিষার তেল বা
নারিকেল তেল ব্যবহার করতে পারেন এই কাজে। এই মালিশ পেটের পেশী শিথিল করে গ্যাস
বের হতে সাহায্য করে। বাম কাত হয়ে শোয়ার অভ্যাস করুন, বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর
সময়। এই ভঙ্গিতে আপনার পাচনতন্ত্র সহজে কাজ করতে পারে এবং জরায়ুর চাপও কম পড়ে।
প্রথমে অভ্যস্ত না হলেও ধীরে ধীরে এটা আপনার জন্য স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করুন দিনে কয়েকবার। এই সহজ কাজটা আপনার পেটের
পেশী শিথিল করে এবং জমে থাকা গ্যাস বের হতে সাহায্য করে। মানসিক চাপ কমাতেও এই
ব্যায়াম দারুণ কার্যকর। কুসুম গরম পানির সেঁক দিন পেটে, যখন অস্বস্তি বেশি অনুভব
করবেন। একটা পরিষ্কার কাপড়ে গরম পানির ব্যাগ মুড়িয়ে পেটে ধরে রাখুন কিছুক্ষণ।
এই তাপ পেশী শিথিল করে গ্যাসের চাপ কমিয়ে দেয়। মৌরি ভেজানো পানি খেতে পারেন
সারাদিন ধরে।
রাতে এক চামচ মৌরি পানিতে ভিজিয়ে রাখুন, সকালে ছেঁকে খান। এই পানি আপনার
হজমশক্তি বাড়ায় এবং পেট ফাঁপা কমায়। এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলো একসাথে করলে আপনি
দ্রুত পার্থক্য বুঝতে পারবেন। কোনো একটা পদ্ধতি আপনার জন্য বেশি কাজ করতে পারে,
আবার অন্যটা কম। নিজের শরীরের কথা শুনুন আর সেই অনুযায়ী এই উপায়গুলো ব্যবহার
করুন।
গর্ভাবস্থায় পেটে গ্যাস হলে কী কী কাজ এড়িয়ে চলবেন?
কিছু কাজ আছে যেগুলো আপনার গ্যাসের সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। না জেনে
করা এই ছোট ছোট ভুলগুলোই আসলে বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। চলুন দেখে নিই
কোন কাজগুলো এড়িয়ে চলা আপনার জন্য জরুরি। গর্ভাবস্থায় পেটে গ্যাস হলে করণীয়
কি ও সমাধান জানার পাশাপাশি কোন অভ্যাসগুলো বাদ দিতে হবে সেটাও সমান
গুরুত্বপূর্ণ। খাওয়ার পরপরই শুয়ে পড়বেন না, এই ভুলটা অনেক মা-ই করে ফেলেন।
শুয়ে পড়লে খাবার হজম হতে বেশি সময় নেয় এবং গ্যাস আরও বেশি জমে থাকে। অন্তত
আধঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা বসে থাকুন বা হালকা হাঁটুন। তাড়াহুড়ো করে খাওয়া একদম
বন্ধ করে দিন এখনই। দ্রুত খেলে আপনার মুখ দিয়ে বেশি বাতাস পেটে ঢুকে যায়।
এই বাতাসই পরে গ্যাসে রূপ নেয়, তাই ধীরেসুস্থে চিবিয়ে খাওয়ার অভ্যাস করুন।
স্ট্র দিয়ে পানীয় পান করা এড়িয়ে চলুন, বিশেষ করে কার্বোনেটেড পানীয়। স্ট্র
দিয়ে খেলে আপনার পেটে অতিরিক্ত বাতাস ঢুকে যায়। এটা সরাসরি পেট ফাঁপার কারণ
হয়ে দাঁড়ায়। খুব টাইট কাপড় পরা থেকে বিরত থাকুন এই সময়ে। শক্ত বেল্ট বা
আঁটসাঁট পোশাক আপনার পেটে অতিরিক্ত চাপ দেয়। এতে হজমপ্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং
গ্যাসের সমস্যা আরও বেড়ে যায়। দীর্ঘক্ষণ একভাবে বসে থাকবেন না, বিশেষ করে
খাওয়ার পর। নড়াচড়া কম হলে আপনার পাচনতন্ত্রও অলস হয়ে পড়ে। মাঝে মাঝে উঠে
দাঁড়ান, একটু হাঁটাচলা করুন। চুইংগাম চিবানো থেকে দূরে থাকুন, যতই এটা স্বাদে
ভালো লাগুক।
চুইংগাম চিবানোর সময় আপনি প্রচুর বাতাস গিলে ফেলেন। এছাড়া অনেক চুইংগামে থাকা
কৃত্রিম মিষ্টিও গ্যাস বাড়ায়। নিজের ওষুধ নিজে খাওয়া একদম বন্ধ করুন। গ্যাসের
কোনো ওষুধ বা অ্যান্টাসিড ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া খাবেন না। গর্ভাবস্থায় কিছু
ওষুধ আপনার এবং বাচ্চার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। মানসিক চাপ নিয়ে বসে থাকবেন না,
এটাও গ্যাস বাড়ানোর একটা কারণ।
দুশ্চিন্তা আপনার হজমপ্রক্রিয়াকে সরাসরি প্রভাবিত করে। মন হালকা রাখার চেষ্টা
করুন, পছন্দের কাজ করুন। এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলো এড়িয়ে চললে আপনি নিজেই পার্থক্য
টের পাবেন। শরীরের প্রতি একটু সচেতন হলেই অনেক অস্বস্তি এড়ানো সম্ভব। নিজের যত্ন
নিন, কারণ আপনি সুস্থ থাকলেই আপনার সন্তানও সুস্থ থাকবে।
গ্যাস কমাতে হাঁটা, পানি পান ও দৈনন্দিন অভ্যাসের ভূমিকা
দৈনন্দিন কিছু ছোট অভ্যাসই আসলে আপনার গ্যাসের সমস্যা কমানোর সবচেয়ে বড়
হাতিয়ার। কোনো জটিল ওষুধ বা চিকিৎসা ছাড়াই আপনি শুধু জীবনযাত্রায় সামান্য
পরিবর্তন এনে অনেকটা স্বস্তি পেতে পারেন। চলুন দেখি হাঁটা, পানি আর কিছু অভ্যাস
কীভাবে আপনার সহায়ক হতে পারে। হাঁটা আপনার হজমতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে সহজ ও
কার্যকর ব্যায়াম। প্রতিদিন খাওয়ার পর অন্তত ১৫-২০ মিনিট হালকা হাঁটলে আপনার
অন্ত্র সচল থাকে। এতে জমে থাকা গ্যাস স্বাভাবিকভাবেই বের হয়ে যায়, আর আপনি
হালকা বোধ করেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে একটু হাঁটার অভ্যাস করলে সারাদিনের
হজমপ্রক্রিয়াও ভালো থাকে। আপনার শরীর সক্রিয় হলে অন্ত্রও তার কাজ সহজে করতে
পারে।
বাইরে না গেলেও ঘরের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করলেও কাজ হবে। পানি আপনার শরীরের সবচেয়ে
সহজলভ্য কিন্তু সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। দিনে অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি খেলে আপনার
পাচনতন্ত্র মসৃণভাবে কাজ করে। পানির অভাবে খাবার পেটে বেশি সময় থেকে গ্যাস তৈরি
করে, তাই এই অভ্যাস অবহেলা করবেন না। সারাদিন অল্প অল্প করে পানি খান, একসাথে
অনেক বেশি না খেয়ে। খাওয়ার ঠিক আগে বা পরে বেশি পানি খেলে হজমে সমস্যা হতে
পারে। তাই খাবারের আধঘণ্টা আগে বা পরে পানি খাওয়ার অভ্যাস করুন। নিয়মিত ঘুমের
সময় ঠিক রাখাও আপনার হজমতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে
যাওয়া এবং একই সময়ে ওঠা আপনার শরীরের ছন্দ ঠিক রাখে।
আরো পড়ুনঃ মাসিকের সময় অতিরিক্ত দুর্বল লাগলে করণীয়
এলোমেলো ঘুম আপনার পাচনতন্ত্রকেও অগোছালো করে দেয়। দিনে নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়ার
অভ্যাস গড়ে তুলুন, যতটা সম্ভব একই সময়ে। আপনার শরীর যখন একটা রুটিনে অভ্যস্ত
হয়ে যায়, তখন হজমপ্রক্রিয়াও সহজ হয়ে ওঠে। এলোমেলো সময়ে খাওয়া আপনার পেটকে
বিভ্রান্ত করে দেয়। হালকা যোগব্যায়াম বা স্ট্রেচিং আপনার দৈনন্দিন রুটিনে যোগ
করতে পারেন। ডাক্তারের অনুমতি নিয়ে কিছু সহজ ভঙ্গি করলে আপনার পেটের পেশী শিথিল
থাকে।
এটা গ্যাস কমানোর পাশাপাশি আপনার মনও ফুরফুরে রাখে। এই সব অভ্যাস একদিনে গড়ে ওঠে
না, ধীরে ধীরে আপনার জীবনযাত্রায় যোগ করুন। ছোট ছোট পরিবর্তনই দীর্ঘমেয়াদে বড়
পার্থক্য তৈরি করে। নিজের প্রতি একটু যত্নশীল হলেই আপনি এই কঠিন সময়টা অনেক সহজে
পার করতে পারবেন।
গ্যাস ভেবে দেরি না করে কখন ডাক্তার দেখাবেন?
গর্ভাবস্থায় পেটে গ্যাস হলে করণীয় কি ও সমাধান জানা যেমন জরুরি, তেমনি জানা
দরকার কখন এটা আর সাধারণ গ্যাস নয়। বেশিরভাগ সময় পেটের অস্বস্তি নিরীহ হলেও,
কিছু লক্ষণ আছে যেগুলো আপনার অবহেলা করা একদম উচিত না। নিজের শরীরের প্রতি সচেতন
থাকা মানেই আপনার এবং আপনার সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তীব্র এবং অসহনীয়
পেটব্যথা হলে সাথে সাথে ডাক্তারের কাছে যান। সাধারণ গ্যাসের ব্যথা আসে-যায়,
কিন্তু যদি ব্যথা ক্রমাগত বাড়তে থাকে বা একই জায়গায় স্থির থাকে, তাহলে এটা
গ্যাস নাও হতে পারে। এই ধরনের ব্যথাকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। রক্তপাত হলে
সেটা কখনোই গ্যাসের সাথে মিলিয়ে ফেলবেন না।
যোনিপথে সামান্যতম রক্তপাত দেখলেও দেরি না করে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করুন। এটা
গুরুতর কোনো সমস্যার লক্ষণ হতে পারে, তাই সতর্ক থাকা জরুরি। জ্বর সহ পেটব্যথা হলে
সেটাও একটা বিপদ সংকেত। সাধারণ গ্যাসের সাথে জ্বর আসার কথা না, তাই এই দুটো
একসাথে দেখা দিলে সতর্ক হোন। এটা কোনো সংক্রমণের ইঙ্গিত হতে পারে। বমি বমি ভাব বা
বারবার বমি হওয়ার সাথে পেটব্যথা থাকলে গুরুত্ব দিন। স্বাভাবিক মর্নিং সিকনেসের
সাথে এই লক্ষণকে গুলিয়ে ফেলবেন না। বিশেষ করে দ্বিতীয় বা তৃতীয় ত্রৈমাসিকে এমন
হলে অবশ্যই ডাক্তার দেখান। শ্বাসকষ্ট বা বুকে চাপ অনুভব করলে এটাকে সাধারণ
গ্যাসের সমস্যা ভেবে অবহেলা করবেন না।
মাঝে মাঝে বুক ও পেটের ব্যথা একসাথে গুলিয়ে যায়, কিন্তু শ্বাসকষ্ট থাকলে সেটা
ভিন্ন কিছুর ইঙ্গিত দিতে পারে। এই লক্ষণ দেখলে দ্রুত চিকিৎসা নিন। বাচ্চার
নড়াচড়া কমে যাওয়া একটা গুরুত্বপূর্ণ সতর্কীকরণ চিহ্ন। আপনি যদি লক্ষ্য করেন
বাচ্চা স্বাভাবিকের চেয়ে কম নড়ছে, সাথে পেটে অস্বস্তিও আছে, তাহলে দেরি করবেন
না। এটা গ্যাসের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া বা
রক্ত দেখলে সেটাও গ্যাসের সাথে গুলিয়ে ফেলা যাবে না।
এটা মূত্রনালীর সংক্রমণের লক্ষণ হতে পারে, যা চিকিৎসা না করলে গর্ভাবস্থায়
জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাই এমন কিছু দেখলে সাথে সাথে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
আপনার instinct-কে বিশ্বাস করুন। কোনো কিছু "ঠিক মনে না হলে" সেটা উপেক্ষা করবেন
না, বরং ডাক্তারের সাথে কথা বলুন। সাবধানতা কখনো বাড়াবাড়ি হয় না, বিশেষ করে
যখন প্রশ্নটা আপনার এবং আপনার সন্তানের সুস্থতার।
শেষ কথাঃ লেখকের মন্তব্য
গর্ভাবস্থার এই নয়টা মাস আপনার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর আর সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং
একটা সময়। পেটে গ্যাস, ফোলাভাব, অস্বস্তি-এগুলো সেই যাত্রার ছোট ছোট অংশ মাত্র।
এগুলো আপনাকে দুর্বল করে দেওয়ার কথা না, বরং আরও সচেতন করে তোলার কথা। আপনি একা
নন এই পথে। প্রতিটা মা কমবেশি এই একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান, যদিও কেউ এটা
নিয়ে বেশি কথা বলে না। তাই লজ্জা না পেয়ে নিজের শরীরের কথা শুনুন এবং প্রয়োজনে
অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।
ছোট ছোট অভ্যাস বদলেই আপনি অনেক বড় স্বস্তি পেতে পারেন। খাওয়ার ধরন, হাঁটাচলা,
বিশ্রাম-এই সাধারণ জিনিসগুলোই আসলে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান। জটিল কিছুর দরকার
নেই, শুধু নিয়মিত হতে হবে। তবে মনে রাখবেন, প্রতিটা শরীর আলাদা। আপনার জন্য যা
কাজ করছে, সেটা অন্য কারো জন্য নাও করতে পারে। নিজের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিন এবং
সেই অনুযায়ী নিজের যত্ন নিন।
এই লেখাটা আপনার পাশে থাকার একটা ছোট চেষ্টা মাত্র। কোনো কিছু নিয়ে সন্দেহ হলে
বা অস্বস্তি বাড়তে থাকলে দ্বিধা না করে ডাক্তারের সাথে কথা বলুন। আপনার আর আপনার
সন্তানের সুস্থতাই সবচেয়ে বড় কথা। এই সময়টা কেটে যাবে, ঠিক যেমন যায় সব কঠিন
সময়। নতুন অতিথির অপেক্ষায় নিজেকে ভালো রাখুন, নিজের যত্ন নিন। আপনি পারবেন-এই
বিশ্বাসটা সবসময় নিজের সাথে রাখুন।




ইনফোনেস্টইনের শর্তাবলী মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট পর্যাবেক্ষন করা হয়।
comment url